এবাদত আলী
আনন্দ ভ্রমণের তৃতীয় দিনে অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ খিস্টাব্দ তারিখে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাত্রা। যাবার পথে গহীন অরণ্যে পাহাড় আর পাহাড়। গাছের শুকনো পাতার মর্মরধনি সব কিছুকে ছাপিয়ে বিকট শব্দে হর্ন বাজাতে বাজাতে ছুটে চলেছে আমাদের বিলাস বহুল কোচ। এরপর বুলাখালি বিডি আর ক্যাম্প। সীমান্ত ফাঁড়িতে সীমান্ত রক্ষী হিসেবে বিডিআরের জোয়ানরা দায়িত্ব পালন করছে। সীমান্ত এলাকা হতে চোরাকারবারিদের এই একটিমাত্র পথ। তাই বিডিআর জোয়ানরা টেকনাফ অভিমুখে বাস মিনিবাস, কোচ, প্রাইভেট কার চেক করেনা। শুধু ফিরতি গুলো চেক করে থাকে এবং অবৈধ মালামাল পেলে তা আটক করে থাকে। কিছু দুর যাবার পর পালঙ্কখালি ঘুর্নিঝড় আশ্রয় কেšদ্র চোখে পড়লো। এই এলাকায় বিস্তিীর্ন সমতল ভূমি রয়েছে। এখানকার চাষীরা প্রচুর পরিমাণে তরমুজের আবাদ করে থাকে। হোয়াংহো বাজার পাড়ি দিবার পর আবার সমতল মাঠ। এই মাঠ পেরিয়েই ঝিলিংখালি বিডিআর ক্যাম্প। এর পাশেই বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকেই দুরে নাফ নদী চোখে পড়ে। এরপর নীলাবাজার বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে সামান্য কিছু দুর অগ্রসর হবার পর লবন ঘের বা লবন উৎপাদনের জমি। জমি গুলো বেশ সমতল। জমি থেকে খালের মাধ্যমে সমুদ্রের লোনা পানির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে লবন সংগ্রহ করা হয়। সমুদ্রে জোয়ারের সময় পানি স্ফীত হয়ে নদীর মোহনা ছাপিয়ে সংযোগ খাল দিয়ে লবনাক্ত পানি আইল বাঁধানো খন্ড খন্ড জমিতে প্রবেশ করে। লবন উৎপাদনকারি চাষীরা ভাটার সময় তড়িৎ গতিতে জমির কাটা আইলের অংশ বাঁধ দিয়ে জোয়ারের সময় আসা লবনাক্ত পানি আটকে রাখে। পরবর্তীকালে ঐ পানি শুকিয়ে জমিতে লবনের স্তর পড়ে। সেই স্তর থেকে তারা লবন সংগ্রহ করে তা রিফাইনারি মেশিনে পাঠায় এবং লবন প্রস্তুতের পক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে। লবন ঘের দেখার জন্য আমাদেও কোচ কিছু সময়ের জন্য থামানো হলো এবং ঘের পরিদর্শনের পর পুনরায় সামনের দিকে এগিয়ে চল্লো।
বেশ কিছু পাহাড়ি পথ অতিক্রম করার পর ডাইনে পাহাড়ের পাদদেশে লাইক্ষাংছড়ি নামক রহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবির চোখে পড়লো। বার্মা বা মায়ানমার সামরিক সরকারের অত্যাচারে সে দেশের সাধারণ জনগণ নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে মায়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। মায়ানমারের আড়ই লাখ শরনার্থীর মধ্যে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৩০ হাজার রহিঙ্গা শরনার্থী তাদের নিজ দেশে ফেরত গেছে। কিন্তু ২০ হাজার শরনার্থীদের দেশে ফেরা সম্পর্কে এখনো কোন সুরাহা হয়নি। তাই তারা এই শিবিরে অবস্থান করছে।
কিছু দুর যাবার পর দমদমিয়া বিডিআর চেক পোস্ট। দূর থেকে আমাদের কোচ থামানোর জন্য সংকেত দেয়া হলো। ড্রাইভার কোচ থামালেন। ফাঁড়ির দায়িত্বে নিয়োজিত জনৈক কর্মকর্তা এগিয়ে এলেন। সোজা কোচের পা দানিতে উঠে এসে আমাদেরকে সালাম জানালেন। কোচ থেকে সকলকেই নামার জন্য অনুরোধ করলেন। তার এহেন আচরণে আমরা হতবাক। হঠাৎ এধরণের আচরণ কেন? তিনি মৃদু হেঁসে বললেন আপনারা আমার দেশী। তাই সকলকেই এক কাপ করে চা খাওয়াবো।ভদ্রলোকের বাড়ি নাটোর জেলার লালপুরে। অনেক দিন ধরে আছেন এখানে। বললেন আপনাদের ব্যানার দেখে কোচ থামাতে বলেছি। আপনাদেরকে পেয়ে আমার খুউব ভালো লাগছে। সবাই নয়, তাঁর অনুরোধে চার পাঁচজন গেলাম তাঁর ফাঁড়ির বাসস্থানে। তাঁর আপ্যায়ন সত্যিই মনে রাখার মত। তিনি টেকনাফ সম্পর্কে বেশ কিছু শতর্কমূলক উপদেশ দিলেন যেন আমরা তা মেনে চলি।
অতঃপর আমরা ঘন অরণ্য পেরিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। এই এলাকার নাম টেকনাফ। নাফ নদীর তীরে অবস্থিত এই এলাকাটি পূর্বে আরাকানের অংশ ছিলো। ১৬৬০ সালে নবাব শায়েস্তা খানের পুত্র বুজর্গ উমেদ খানের নেতৃত্বে কক্সবাজার জেলার অনেক এলাকা মোঘল সাম্রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত হলেও টেকনাফ ছিলো স্বতন্ত্র এলাকা। ১৭৯০ সালে চট্টগ্রাম থেকে নাফ নদী পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এলাকা বাড়ানো হলে টেকনাফ এর আওতায় আসে। টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে টেকনাফের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখে আমরা মুগ্ধ হলাম। এক প্রান্তে নাফ নদী। অপর প্রান্তে বিশাল সমুদ্র সৈকত। অপর পাশে সুউচ্চ পাহাড়। সাগর আর পাহাড়ের লুকোচুরি খেলা।
টেকনাফ কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা। এ উপজেলার মোট লোক সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার। পরিবারের সংখ্যা ১৮ হাজার ৩’শ ৫০টি। বাংলাদেশের সব চেয়ে কম শিক্ষার হার এই টেকনাফে। মাত্র ১০ শতাংশ লোক শিক্ষিত। বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জনৈক ব্যক্তিকে জিঞ্জাসা করেছিলাম এখান থেকে সমুদ্র সৈকত কত দুরে। কিন্তু সমুদ্র সৈকত সে চেনেনা। বললাম ইয়ে মানে সী-বিচ কতদুর। লোকটি চট করে উত্তর দিলো হেতাই কননারে, সী-বিচ তিন ত্রিমিনাল পথ হবেরে। বুঝতে কষ্ট হলোনা যে কিলোমিটার শব্দ তার কাছে অপরিচিত। টেকনাফের অধিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ লোক মাছ ধরার পেশার সাথে জড়িত। তারা প্রতিদিন ছুরি মাছ, রূপচাঁদা, লইট্যা, ফাইস্যা, মাইট্যা, ইছা বা চিংড়ি, লাইক্যা, দাঁতিনা , ইলিশ, ফোয়া, তাইল্যা ও চাঁন্দা মাছ ধরে। মাছ ধরার কাজে তারা বেহন্দি জাল ব্যবহার করে। শুধু মাছ ধরাই তাদের পেশা নয়। ঐ সকল মাছ শুটকি করে তা বিভিন্ন স্থানে চালান দিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। এছাড়া লবন ঘের থেকে লবন সংগ্রহ, তরমুজ ফসল, পান-সুপারি ও নারকেলের গাছ থেকে নারকেল পেড়ে বাজারে বিক্রি করে তা থেকে অর্থ উপার্জন করে থাকে। কিছু সংখ্যক লোক আবার ধান চাষ ও করে। এখানকার হ্যাচারি ব্যবসাও বেশ লাভজনক। এই টেকনাফে রয়েছে বিশাল বনজ সম্পদ। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষণা মতে টেকনাফের বালুকাবেলায় রয়েছে অনেক খনিজ সম্পদ যা বাংলাদেশের অন্যতম দিক হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে। টেকনাফে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভালো ক্ষেত্র রয়েছে বলেও গবেষকগণ মন্তব্য করেছে বলে জানা যায়। টেকনাফে আছে পীর বদর শাহের স্মৃতি বিজড়িত সাবরাং ইউনিয়নের শাহ পরী দ্বীপের বদর মোকাম।
টেকনাফে বসবাস করে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ। এই রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবন বড়ই বিচিত্র। মেয়েরা তাঁত বোনে। দোকানের সেলসম্যান হিসেবে সওদা বিক্রি করে। তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার বড়ই অদ্ভুত। এদের ধর্মের প্রচলিত নিয়মানুসারে প্রত্যেক পুরুষ সদস্যকে বিয়ের আগে যে কোন সমং (সাত বছরের অধিক বয়সি) প্রবাজিত হয়ে শ্রমন জীবন (মংশাবাওয়াহ) গ্রহণ করতে হয়। সে কারনে কেয়ায়ং অর্থাৎ সাত দিন বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করতে হয়। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ: ১২/০৫/২০২৬.
