এবাদত আলী
(পুর্ব প্রকাশের পর)
১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আহমেদ রফিক জয়লাভ করেন এরই কিছু দিন পর ২২ ডিসেম্বর পাবনা শহরের দক্ষিনরাঘবপুরে নিজ বাড়িতে প্রবেশ করার মুহূর্তে ছাত্র ইউনিয়নের ভাসানী ন্যাপের নকশাল নামধারীরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
২৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার বাসায় আসেন। সমবেদনা জানান এবং এদিন আরিফপুর গোরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত করেন এবং বিকালে পাবনা পুলিশলাইন মাঠে শহীদ আহমদ রফিকের স্মরণে শোক সভায় বক্তব্য দেন।
আমি ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল তারিখে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৭১ সালে সরকারি চাকুরি হতে আমাকেসহ পুর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৪শ জনকে একই স্েঙ্গ ছাঁটাই করা হলে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ হতে বেকারত্বের খাতায় নাম লেখাতে হয়। ফলে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আমার আর কোন কাজ থাকেনা।‘ নেই কাজ তো খৈ ভাজ ’ ধরনের অবস্থা। পাবনা শহরের নেতৃবৃন্দ তাই আমাকে আমার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের দায়িত্ব দেন । এলাকার যুব সমাজ ও ছাত্র সমাজের কাছে ছাত্র লীগের নেতা হিসাবে পরিচিতি থাকায় সেই কাজটি আমার জন্য সহায়ক হয় ।
আমার সখের নতুন ফনিক্স সাইকেল খানাকে সঙ্গি হিসাবে কাজে লাগাই। সকালে চারটে খেয়ে বাড়ি থেকে বের হই। ফিরি রাতের বেলা।
কথায় বলে যেখানে রাত সেখানেই কাত। আমারও যেন ঠিক সেই অবস্থা। পাবনা শহরের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নতুন করে সখ্যতা গড়ে ওঠে। আমার অগ্রজ পাবনা জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার লালু (স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে আততায়ীর হাতে নিহত), এডওয়ার্ড কলেজের সাবেক জিএস সোহরাব উদ্দিন সোবা (বর্তমানে মৃত), ছাত্র নেতা মোহাম্মদ নাসিম ও ফজলুর রহমান পটল সাবেক মন্ত্রী (বর্তমানে মৃত), তোফাজ্জল চৌধুরী, রবি উল ইসলাম রবি, মোহাম্মদ ইকবাল (বর্তমানে মৃত), এম মুক্তার আলী, আব্দুল লতিফ (বর্তমানে মৃত), আফ্ফান আলী, আমার অনুজ প্রতিম ছাত্র নেতা পুর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুল (২০০০ সালের ১০ই নভেম্বর সিরাজগঞ্জের কোনাবাড়িয়া নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত), সালাহ উদ্দিন সোহেল, সহপাঠি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু (বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি), গোলাম সরওয়ার খান সাধন (সঙ্গীত শিল্পী, স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ), জাহিদ হাসান জিন্দান (টেবুনিয়া ওয়াছিম পাঠশালার সাবেক প্রধান শিক্ষক), (বর্তমানে মৃত) বেবী ইসলাম, নুরুল ইসলাম নুরু (মালিগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান) (বর্তমানে মৃত) সাবেক পাবনা পৌর চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম বিশু, অ্যাডভোকেট শাহজাহান আলী, কামরুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম মুক্তাসহ অনেকের সাথে নতুন করে আবার সখ্যতা গড়ে ওঠে।
বিশেষ করে রফিকুল ইসলাম বকুলের সাথে বেশি বেশি যোগাযোগ হয়। কারণ আমার গ্রামের বাড়ি মালিগাছা ইউনিয়নের বাদলপাড়া গ্রাম এবং আশে পাশের গ্রামগুলো তে তাঁর পদচারণা ছিল। তাছাড়া পাবনা শহরের পশ্চিমাঞ্চলের ছাত্রদের মধ্যে বেশিরভাগ ছাত্রই তখন ছাত্র লীগের সদস্য ছিলেন।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ হতে যখন সমগ্র পুর্ব পাকিস্তানের মত পাবনা জেলাতেও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় তখন ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’কে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন কল্পে একাধিকবার বকুল এই এলাকায় আসেন এবং ছাত্র ও যুব সমাজকে চাঙ্গা করে রাখেন।
পাবনা জেলার বিশাল অঞ্চল বিশেষ করে পাবনার পশ্চিমাঞ্চলে হিমায়েতপুর, মালিগাছা মালঞ্চি ও দাপুনিয়া ইউনিয়নে সব চেয়ে বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর তা হলো এই এলাকাটি নকশালেরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করে।
ষাটের দশকের শেষ দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি নামাক স্থানে এক উগ্রপন্থি নেতা চারু মজুমদার নকশাল বাড়িতে বিস্ফোরন ঘটায় এবং তখন তিনি সকলের নিকট নকশাল নেতা হিসাবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাসানী ন্যাপেরে কিছু নেতা-কর্মি এই নকশালী তৎপরতায় যোগ দেয় এবং নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার চালানো আরম্ভ করে। পাবনার আমিনুল হক টিপু বিশ্বাস, বারি সরদার, আখতারুজ্জামান আখতার, রাধানগরের নুরু খন্দকারের ছেলে মাসুদ (মৃত), নুরপুরের শহিদ(স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নিহত), পৈলানপুরের খোকন, কাশেম বিশ্বাস,(মৃত), পাবনা শহরের হামিদ, দাপুনিয়া ইউনিয়নের টিকরি গ্রামের রজিববুল্লা বিশ্বাস ওরফে রতন বিশ্বাস (নিহত) , তার বড় ছেলে জমশেদ (নিহত), কাসেম, মান্নান, ছলেমান, ভজলু, জোতআদম গ্রামের দেলোয়ার হোসেন (নিহত), বাদলপাড়ার লালচাঁদ (নিহত), মকবুল (নিহত), আলেপ (নিহত), হায়াত আলী। শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের এস্কেন্দার (নিহত), গাফ্ফার (নিহত), জলিল (নিহত), শহিদ (নিহত), হামিদ ওরফে হক্কেল, মহব্বত খোনকার (নিহত), মোসলেম (নিহত), হারুন (নিহত), মতি (নিহত), হাকিমদ্দিন মোল্লা(নিহত), মজনু(নিহত), ভাঁজপাড়া গ্রামের মুঞ্জিল (স্বাধীনতার পরে নিহত), চাঁদপুর গ্রামের আলীউজ্জামান, মালিগাছা ইউনিয়নের মালিগাছা গ্রামের ফরিদ (নিহত), নবাব আলী, মজিবর, মান্নান, হান্নানসহ শতাধিক ব্যক্তি নকশালী তৎপরতা শুরু করে। এসময় ইসলামী ছাত্র সংঘ নামে একটি সংগঠন ছিলো যারা জামাতে ইসলামীর লেজুড় বৃত্তি করতো। ছাত্রদের আরেকটি সংগঠন ছিল য়ার নাম ছিল এন এস এফ । এই এন এস এফ এর সক্রিয় নেতা ছিলো রাধানগর মজুমদার পাড়ার আব্দুল বাতেন, পাবনা শহরের রিদ্দিক (পরে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে শহীদ), আটঘরিয়ার শাহজাহান আলী, (বর্তমানে এ্যাডভোকেট ও সাবেক অধ্যক্ষ),আব্দুস সাত্তার মোল্লা (সাবেক চেয়ারম্যান দেবোত্তর ইউনিয়ন পরিষদ, আটঘরিয়া, পাবনা,( মৃত),
আমরা যারা অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম নকশালরা তাদেরকে তাদের দলে ভিঁড়াবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করতো। আমাদের অবস্থান নকশালদের বিপক্ষে থাকায় আমাদের জীবনের উপর হুমকি ছিল যথেষ্ট। কারণ তাদের কাছে তখন অস্ত্র ছিল প্রচুর। হিমায়েতপুরের পশ্চিমে দিয়াড়বোয়ালিয়াতে তাদের একটি অস্ত্র ভান্ডার ছিল। সেই অস্ত্র তারা এই সকল এলাকার অশিক্ষিত যুবক ও শিক্ষিতবেকার
যুবকদের মাঝে বিতরণ করে দেয়। ফলে আমাদের জন্য তখন এলাকায় অবস্থান করাটাই ঝুঁকিপূর্ন হয়ে ওঠে। তার পরও আমারা সাহস হারাইনি। আমাদের এলাকার শতাধিক যুবক ও ছাত্রকে আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসাবে একত্র করে ধরে রেখেছিলাম। আমাদের গ্রামের পাশে ছিল বাঙ্গাবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা। এই মাদ্রসার নিকটে একটি প্রকান্ড বট গাছ ছিল আমাদের ঠিকানা।পদ্মার শাখা রতœাইনদীর (বাঙ্গর নদী) উত্তর তীর ঘেঁষে এই বটগাছের নিচেই প্রতি দিন বিকালে একই সময়ে আমরা হাজির হতাম। চলতো শলাপরামর্শ ।
দেখতে দেখতে মার্চ মাস এসে গেল। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা সেই উত্তাল মার্চ মাস। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। পাবনার প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। (ক্রমশঃ) (লেখক; সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি.
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব, ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ; ০৮/০৩/২০২৬
