মওলানা ভাসানী সেতুর নিরাপত্তাকর্মী সরিয়ে নেয়ার পর ঘটছে নানা অঘটন

হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
গত ২০ আগষ্ট গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ-চিলমারী তিস্তা নদীর উপর ‘মওলানা ভাসানী সেতু’ উদ্বোধনের পর হতে সেতুর দুই পাশ থেকে নিরাপত্তাকর্মী সরিয়ে নেয়ায় একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। বিষয়গুলো নিয়ে এলাকাবাসির মাঝে ব্যাপক সমালোচনা ও পর্যালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকে সৃষ্ট অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না। এলাকার অনেকের দাবি দীর্ঘ ১১ বছরে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটল না, এখন কেন এসব হচ্ছে। এলাকাবাসির দাবি ঘটনাগুলো পরিকল্পিত এবং রহস্যজনক।
উদ্বোধনের একদিন পরেই ল্যাম্পপোস্টের ৩১০ মিটার বিদ্যুতের তার চুরির রেশ কাটতে না কাটতেই সেতুর রিফ্লেক্টর লাইট চুরির ঘটনা ঘটেছে। এরপর ২৪ আগস্ট রোববার রাতে মোটরসাইকেল দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন দুই যুবক হাদিয়া জামান ও মোকছেদুল ইসলাম। এটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অস্বস্তি সৃষ্টিসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
‎ রিফ্লেক্টর লাইট চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশল উজ্জ্বল চৌধুরী বলেন, রিফ্লেক্টর লাইট চুরির বিষয়টি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেনেছেন। স্থানীয় পুলিশকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সেতুর ল্যাম্পপোস্টের বিদ্যুৎ সংযোগের তার চুরির বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করা হয়েছে। সেতুর সিকিউরিটি ইনচার্জ নুর আলম বাদী হয়ে গত শুক্রবার রাতে মামলা দায়ের করেছেন। দুষ্কৃতকারীদের ধরতে পুলিশ চেষ্টা করছে। ৩১০ মিটার বৈদ্যুতিক তারের আনুমানিক মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে নতুন করে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ারও কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, সেতুটি দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ হলেও সেখানে নেই কোনো ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণ, নেই সিসি ক্যামেরা বা স্পিড ব্রেকার। ফলে গাড়িগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মী না থাকা এবং সেতু অন্ধকারে ডুবে থাকে, কারণে বৈদ্যুতিক তার ও রিফ্লেক্টর লাইট চুরি হয়েছে।
উপজেলার পাঁচপীর বাজারস্থ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এস এ এস এর নিবার্হী পরিচালক এ বি এম নূরুল আক্তার মজনু বলেন, সেতুর নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, প্রায় নয়শত পঁচিশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি মেগা প্রকল্পে কীভাবে ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়নি? সামাজিক মাধ্যমে অনেকে লিখেছেন, ‘প্রতিদিন কত প্রাণ ঝরবে, কত পরিবার কাঁদবে?’ কেউ কেউ এও বলেছেন, ‘এটি শুধুই সরকারি অর্থের অপচয় আর দায়িত্বহীনতার প্রতিচ্ছবি।’
স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেতুটিকে দ্রুত পূর্ণ নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। চুরির ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে। পাশাপাশি সেতুতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও রাতে নিয়মিত পুলিশের মোবাইল টিম চালুরও জোর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দ্রুত নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সেতু ও আশপাশে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন, সার্বক্ষণিক ট্রাফিক পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীর টহল নিশ্চিতকরণ, বেপরোয়া যান নিয়ন্ত্রণে স্পিড ব্রেকার ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো এবং চুরি-ছিনতাই রোধে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ।
হরিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও গাইবান্ধা জেলা জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট নাফিউল ইসলাম জিমি বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সেতুর কাজ চলমান রয়েছে। তখন তো কিছু চুরি হয়নি। এখন কেন হচ্ছে! বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। কিছু কিছু গণমাধ্যম সামন্য বিষয়কে বড় আকারে তুলে ধরছেন। সেটি এলাকার জন্য লজ্জাজনক। এলাকাবাসি যে সব দাবি তুলে ধরেছেন, তা সবই যুক্তিযুক্ত, তবে সময় লাগবে। সেতু কর্তৃপক্ষ এই মহুত্বে সেতুর দুই পাশ হতে নিরাপত্তাকর্মী সরিয়ে নেয়া ঠিক করেনি। যে হেতু আগামী ২০২৬ সালের জনু মাস পর্যন্ত কাজ চলমান থাককে। সেই দিক থেকে নিরাপত্তাকর্মী রাখা প্রয়োজন।
থানার ওসি মো. আব্দুল হাকিম আজাদ বলেন, তার চুরির মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তাছাড়া সেতু এলাকায় প্রতিদিন পুলিশি টহল অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, উদ্বোধনের পর হতে সেতুর দুই পাশ থেকে নিরাপত্তাকর্মী সরিয়ে নিয়েছেন চায়না ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। নিরাপত্তাকর্মী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে
গত ২০ আগষ্ট বুধবার মওলানা ভাসানী সেতুটির উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। ১ হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রস্থের এই সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ সরকার (জিওবি), সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ওফিড) অর্থায়েন এলজিইডির বাস্তবায়েন সেতুটি নির্মিত হয়েছে। সেতুতে মোট ৩১টি স্প্যান রয়েছে। সংযোগ সড়ক ও নদীশাসনসহ প্রকল্পে প্রায় ১৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেতুর উভয় পাশে সংযোগ সড়ক করা হয়েছে ৮৬ কিলোমিটার।