দশই মর্হরম- কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনাবলী

— এবাদত আলী
মানব ইতিহাসে যে সকল ঘটনা মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে এবং ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে তার মধ্যে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার স্থান সবার উর্ধ্বে। কারবালার ঘঁটনা যে শুধু ইতিহাস তাই নয়, বরং তা একটি কালজয়ী আন্দোলন, একটি উজ্জীবনকারি আদর্শ। ফলে তা সর্বযুগেই সত্য ও ন্যায়কামী মানুষকে মিথ্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনুপ্রাণিত করে।
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রেরিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দূত মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) হিজরী ১১ সনের ১২ রবিউল আওয়াল ৬৩ বছর বয়সে ওফাত বরণ করার পর চারজন খলীফা ইসলামের ঝান্ডা উড্ডীন রাখেন। সর্বশেষ চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) রাশিদুন খিলাফতের রাজধানী মদীনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন। ৪০ হিজরী সনের ২১ রমজান হজরত আলী (রা.) আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম আল মুরদী নামক আততায়ীর হাতে শহীদ হন । হজরত আলী (রা.) শহীদ হবার পর তারই জেষ্ঠ পুত্র হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.) কে মুসলিম খেলাফতের উত্তরাধিকরি হিসেবে কুফায় খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।।
এদিকে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর একজন প্রভাবশালী কুরাইশ নেতা আমির মুয়বিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং এরপর থেকে ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। খলিফা হজরত উসমান (রা.) এর শাসনামলে তাঁকে সিরিয়ার গভর্ণর নিযুক্ত করা হয়। খলিফা হজরত আলী (রা.) এর শাহাদত বরনের পর হজরত মুয়াবিয়া (রা.) মুসলিম বিশে^র খলিফা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং দামেষ্কেকে রাজধানী করে উমাইয়া খিলাফতের সুচনা করেন। সিরিয়ার গভর্ণর হজরত মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) হজরত ইমাম হাসান (রা.) এর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাঁকে চিঠির মাধ্যমে পদত্যাগের জন্য চাপ দেন। প্রতিক্রিয়ায় হজরত হাসান (রা.) উবায়দুল্লাহ ইবনে আল আব্বাসের নেতৃত্বে একটি অগ্রণি দল পাঠান হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর অগ্রযাত্রাকে বাধাদানের জন্য। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে উবায়দুল্লাহ এবং তার বেশিরভাগ সৈন্য দল ত্যাগ করে। ৬৬১ সালের আগস্ট মাসে হজরত ইমাম হাসান (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন এই শর্তে যে. কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর শাসন চলবে এবং একটি কাউন্সিল তার উত্তরসুরী ঠিক করবে। সেই সঙ্গে হজরত ইমাম হাসান (রা.) খিলাফত হজরত মুয়াবিয়ার হাতে তুলে দেন ্এবং তিনি কুফা থেকে মদীনায় চলে আসেন। হজরত ইমাম হাসান (রা.) এর সমর্থকেরা সাধারণ ক্ষমা পাবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।
হজরত মুয়াবিয়া (রা.) ইমাম হাসান (রা.) এর সাথে যে চুক্তি করেছিলেন তা নিজের পুত্র ইয়াজিদকে খিলাফতের উত্তরাধিকারী নির্বাচনের মাধ্যমে সেই চুক্তি ভঙ্গ করেন। হজরত ইমাম হাসান (রা.) মদীনায় বসবাসকালে হিজরী ৫০ সনে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর চক্রান্তে এবং প্ররোচনায় তাঁর স্ত্রী জাদা বিনতে আশআস হজরত ইমাম হাসান (রা.) কে বিষপান করিয়ে হত্যা করে।
হজরত ইমাম হাসান (রা.) এর মৃত্যুর পর মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর অপর দৌহিত্র হজরত আলী (রা,) এর কনিষ্ঠ পুত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) খেলাফতের জন্য মনোনিত হননি এবং খেলাফত গ্রহণ করেননি। অপর দিকে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ উত্তরাধিকার বলে খেলাফত লাভ করে। তখন থেকেই প্রশাসনের গুরুত্বপুর্ণ পদ গুলোতে কপট শেণির প্রভাব পাকাপোক্ত হতে থাকে। এই শ্রেণির দৌরাত্বে সমাজ দ্রুত অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে থাকে। এসময় জাহেলিয়্যাত যুগের এমন কিছু রীতি প্রচলন ঘটানো হয় যা অপসারণের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) কে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিলো। ইমাম হোসাইন (রা.) প্রতিটি মূহুর্ত অনুভব করতে লাগলেন যে, ইয়াজিদ তার শাসন কাঠামোতে রাসুল (সা.) এর প্রদর্শিত পখ থেকে বিচ্যুত । যে ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মহা নবী (সা.) এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সেই ইসলামি রাণ্ট্রের শাসক নির্বাচিত হয়েছে ইয়াজিদের মত ধর্মহীন অসদাচারি কপট ব্যক্তি। এসময় স্বজনপ্রীতি, গোত্রপ্রীতি গোটা প্রশাসন যন্ত্রে সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জাহেলিয়াত যুগের অনেক সামাজিক প্রথার প্রচলন ঘটানো হয়। ফলে ইসলামি সমাজ রাসুল (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত কৃষ্টি সংস্কৃতিদ থেকে দ্রুত দুরে সরে যেতে থাকে। উমাইয়া শাসকগোষ্ঠির পকিল্পনাই ছিলো ইসলামকে অন্তঃসারশুন্য করে শুধুমাত্র এর বাহ্যিক খোলসটা বজায় রাখা। মোট কথা পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছিলো যে,সাধারণ মানুষ ইসলামের প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলো। ইসলামের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থই তাদের কাছে মুখ্য বিবেচিত হতে লাগলো। দুঃখজনক ব্যাপার হলো সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ইসলামের ব্যাপারে উদসিীন হয়ে পড়েছিলেন। ফলে মুসলিম জাহানের শাসনকর্তা হিসেবে ইয়াজিদকে তিনি কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারছিলেননা। তিনি অন্যায় অনাচার , জুলুম নির্যাতন ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সিধান্ত গ্রহন করেন। এই অর্থে প্রকৃত ইসলামী আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সংগ্রামে লিপ্ত হন। এই আন্দোলনের প্রথম দিকে কুফা ও অন্যান্য এলাকার কিছু মুসলমান হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু প্রশাসনের প্রচন্ড চাপের মুখে এক পর্যায়ে তারা তাদের আনুগত্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। আবার অনেকেই পার্থিব স্বার্থে বা ইমানী দুর্বলতার কারণে ইমামের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। আবার একদল মুসলমান আন্দোলনে না গিয়ে ঘরে বসে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর জন্য দোয়া করাকেই নিজেদের কর্তব্য বলে মনে করলেন। ইমামের মর্মস্পশী আহ্বান তাদের মনকে স্পর্শ করতে পারলোনা। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) অভিশপ্ত ইয়াজিদের সামনে মাথা নত করেননি, কারণ ইয়াজিদ একজন প্রকৃত মুসলমান ছিলেন না। বরং তিনি একজন নিয়মিত মাতাল হয়ে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে উপহাস করেছিলেন, যিনি তার নিজ স্ত্রী ও নিজ কন্যার মধ্যে পার্থক্য বুঝতেননা। অন্য দিকে হজরত ইমাম হোসাইন হলেন ‘ শাবাব আল জান্নাহ’ ( জান্নাতে যুবকদের সরদার বা নেতা), যেমনটি মহানবী (সা.) বর্ণনা করেছেন। ইয়াজিদ বল প্রয়োগের মাধ্যমে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে তার আনুগত্য স্বীকার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদকে স্বীকার না করেই অবশেষে মক্কায় চলে আসেন এবং সেখানেই অবস্থান করেন।
তাঁর পিতা হজরত আলী (রা.) এবং ভাই হজরত হাসান (রা.) এর রাজত্বকালে কুফা খিলাফতের রাজধানী ছিলো। সেই সুবাদে কুফায় হজরত হোসাইন (রা.) এর যথেষ্ট সমর্থন ছিলো। তাই তিনি কুফার আলীদপন্থীদের নিকট থেকে চিঠি পেয়েছিলেন। কুফার জনগণ ইমাম হোসাইন (রা.) কে কুফায় আসার অনুরোধ জানিয়ে কয়েক হাজার চিঠি দিয়েছিলেন। চিঠিগুলো লেখার মূল কারণ ছিলো তারা ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার শাসনের অবসান চেয়েছিলেন এবং ইমাম হোসাইন (রা.) কে তাদের খলিফা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তারা মনে করেছিলেন হজরত ইমাম হোসাইনের নেতৃত্বে তারা একটি নতুন খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। তারা নিজেদেরকে নিপীড়ক বলে মনে করতো কারণ তাদের জন্য উপযুক্ত কোন নেতা ছিলোনা। তারা হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে বলেছিলেন। হজরত হোসাইন তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য পাঠান। এদিকে ইয়াজিদ কুফার গভর্নর নু’মান ইবনে বশির আল আনসারীকে অপসারন করে বসরার তৎকালিন গভর্নর উবায়দুল্লা ইবনে জিয়াদকে কুফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর দুত হিসেবে মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় পৌঁছালে কুফার জনগণ তাকে স্বাদরে গ্রহন করে। প্রায় ১৮ হাজার লোক তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহন করেন। তারা তাদের জান মাল ইমামের প্রতি উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি ইমামের প্রতি কুফাবাসীর অনুগত্য ও তাদের সমর্থনের কথা জানিয়ে হজরত হোসাইন (রা.) এর নিকট চিঠি পাঠান। অপরদিকে কুফার গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। গভর্নর তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করেন। তার আদেশে মুসলিম ইবনে আকিলকে শহীদ করা হয়।
হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কুফার রাজণৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্পর্কে অবগত ছিলেননা। তবে তিনি সেখানে যাবার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আল জুবায়ের প্রমুখ তাঁকে কুফায় না যাবার পরামর্শ দেন, অথবা যদি তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তাহলে নারী ও শিশুদের সাথে না নেওয়ার পরামর্শ দেন। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)পরিবার পরিজনসহ ৭২ জন সঙ্গী নিয়ে কুফার পথে রওনা হন। মক্কার গভর্নর আমর ইবনে সাইদ তার ভাই এবং ইবনে জাফরকে হজরত হোসাইনের পিছনে পাঠান যাতে তিনি মক্কার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন এবং তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারেন। হজরত হোসাইন (রা.) ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন যে তাঁর নানা হজরত মোহাম্মদ (সা.) তাঁকে স্বপ্নে নির্দেশ দিয়েছেন যে, পরিণতি যাই হোকনা কেন এগিয়ে যেতে। তিনি কোন বাধা না মেনে মরুভুমির মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। যাবার পথে কুফা থেকে কিছু দুরে উমাইয়া গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ উত্তর দিকে যেতে এবং ফোরাত নদীর কুলে কারবালায় শিবির স্থাপনে বধ্য করেন।
৬১ হিজরীর মর্হরমের ২ তারিখে হজরত হোসাইন (রা.) কারবালায় পৌঁছান এবং শিবির স্থাপন করেন। এদিকে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে প্রতিহত করার জন্য ইয়াজিদ কর্তৃক ফোরাতকুলসহ গোটা কারবালা প্রান্তরে ৪ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেন। হজরত হোসাইন (রা.) এর সঙ্গী সাথিদের জন্য ফোরাত নদীর পানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে ইমাম হোসাইন (রা.) বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। পানির কষ্টে হজরত হোসাইন (রা.) এর শিবিরে হাহাকার ওঠে। বিশেষ করে তৃঞ্চার্ত শিশুগণ কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।
এমতাবস্থায় হিজরী ৬১ সালে ১০ মর্হরম (৬৮০ খিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর) সকালে ফজরের নামাজের পর উভয় বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নেয়। অধিকাংশের মতে, এসময় হজরত ইমমি হোসাইন (রা.) এর পক্ষে ছিলো মাত্র ৩২ টি ঘোড়া ও ৪০ জন পদাতিক যোদ্ধা। এ সংখ্যা আরো বেশি ছিলো বলে ভিন্ন মত পাওয়া যায়। এসময় হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)ইয়াজিদেও ন্যৈদেও উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি ইয়াজিদ বাহিনীকে তাঁর নানা হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেন । তিনি বলেন, তোমরা কেন আমাতে হত্যা করতে চাও? আমি কি কোন পাপ অথবা অপরাধ করেছি? ইয়াজিদেও সৈন্যবাহিনী বোবার মত দাঁড়িয়ে রইলো। ইমাম হোসাইন (রা.) বলেন, আমাকে হত্যা করলে আল্লাহর কাছে কি জবাব দিবে? বিচার দিবসে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর কাছে কি জবাব দিবে? তিনি আবার বলেন, হাল মিন নাসরিন ইয়ানসুরুনা? আমাদেরকে সাহায্য করার মত তোমাদের মাঝে একজনও নাই? তিনি আরো বলেন, আমার কথা কি তোমরা শুনতে পাওনা? তোমাদের মাঝে কি একজনও মুসলমান নেই? তখন ইয়াজিদ বাহিনীর অনেক সাহাবী হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর পক্ষে যোগ দেন। অবস্থা ইমাম হোসাইন (রা.) এর পক্ষে যেতে পারে ভেবে ইয়াজিদ বাহিনী তখন শত শত তীর নিক্ষেপ শুরু করে। এরপরই শুরু হয় সরাসরি তরবারি যুদ্ধ। যেখানে ইমাম হোসাইন (রা.) এর অনেক সৈন্যকে হত্যা করা হয়।
থেমে থেমে চলতে থাকে আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণ। হাতা হাতি লড়াইও চলে। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর দুই প্রান্তের সৈন্যরা শত্রুর আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে সমর্থ হয়। অশ^ারোহী শত্রুদেরও সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেন ইমাম হোসাইন (রা.) এর অশ^ারোহী বাহিনী। তবে তীরের আঘাতে অনেক ঘোড়া আহত হয়। সৈন্যরা তখন ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে ইবনে জিয়াদ সব তাঁবুতে আগুন লাগানোর নির্দেশ দিলে ইয়াজিদ বাহিনী হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের জন্য স্থাপিত তাঁবু বাদে বাকি সব তাঁবুতে অগুন লাগিয়ে দেয়। দিনভর যুদ্ধের শেষভাগে ইয়াজিদ বাহিনী সিমারের নেতৃত্বে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। এতে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর পুত্র আলী আকবারসহ তাঁর সঙ্গি সাথি আত্মীয়দের মধ্যে প্রায় সবাই শাহাদত বরণ করেন। এসময় হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর ছোট্ট সন্তান আলী আজগর পানির জন্য অস্থির হয়ে উঠলে ইমাম হোসাইন এবং তাঁর সৎ ভাইআব্বাস (রা.) পানির জন্য ছুটে যান নদীর দিকে। পথে তাদের পৃথক করে ফেলে ইয়াজিদ বাহিনী। এসময় হজরত আব্বাসের কোলে থাকা ছোট্ট আজগরের গায়ে একটি তীর বিদ্ধ হলে তিনিও শাহাদত বরণ করেন।
শিশুপুত্র আজগরের জন্য পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এসময় ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীকে মোকাবিলা করার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেন তাঁর বাহিনী। তারপরও ইয়াজিদ বাহিনী হজরত ইমাম হোসাইনকে সরাসরি আক্রমণের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলো এবং প্রত্যক্ষভাবে কেউই আক্রমণের জন্য সাহসি বা রাজি ছিলোনা। এমন সময় হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর মুখে একটি তীর বিদ্ধ হয়। মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। সেই রক্ত দুই হাতের তালুতে আঁজলা ভরে তা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেন এবং আল্লাহর নিকট এই নৃশংসতার বিচার দাবি করেন। এতে বিরোধী শিবিরের সৈন্যরা আরো বিচলিত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় ইয়াজিদের বিশেষ ভক্ত মালিক ইবনে নুসাইয়ার এগিয়ে আসে। নুসাইয়ার হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর মাথায় সরাসরি আঘাত করে। এতে তাঁর মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে এবং মাথায় বাঁধার জন্য ব্যবহৃত কাপড় (স্কার্ফ) কেটে যায়। রত্তমাখা সেই কাপড় নিয়ে পিছিয়ে যায় মালিক ইবনে নুসাইয়ার। এমন সময় সিমার এগিয়ে যায় এবং ইমাম হোসাইন (রা.) কে উপর্যুপরি আঘাত করতে আদেশ দেয়। এমন সময় হজরত হোসাইন (রা.) কে বাঁচানোর জন্য তাঁবুর নারী ও শিশুরাও এগিয়ে আসে।
হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর কিশোর পুত্র ইমাম জয়নুল আবেদীন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁবুতে ছিলেন, তিনিও তাদের সঙ্গে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালে সকলে মিলে তাঁকে নিবৃত্ত করেন। এক পর্যায়ে একটি শিশু তরবারির আঘাতে একটি হাত হারায়। এতে ইয়াজিদ সৈন্যরা আরো বিচলিত হয়ে পড়লে ক্রুদ্ধ সিমার তার বিশেষ দল নিয়ে এগিয়ে যায় এবং হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে এলোপাথাড়িভাবে আঘাত করতে থাকে।
হজরত হোসাইন (রা.) উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে যান। এই সুযোগে সিমারের নির্দেশে সিনান ইবনে আনাস নামের এক সৈন্য হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে ছুরি দ্বারা আঘাত করে এবং তাঁর মস্তক শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে। হত্যা ও মাথা বিচ্ছিন্ন করার পর উন্মত্ত সিমার ও তার দল হজরত ইমাস হোসাইন (রা.) এর শরীর মোবারকের উপর ঘোড়া চালিয়ে দেয় এবং ঘোড়ার খুরের আঘাতে মৃতদেহ ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। ইমাম হোসাইন (রা.) এর জীবিত অল্পসংখ্যক সদস্যকে তখন স্থানীয় শাসক ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠানো হয়। আরো পাঠানো হয় হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর বিচ্ছিন্ন মাথা। এই বিছিন্ন মাথার মুখে লাঠি ঢুকিয়ে দেয় ইবনে জিয়াদ। এপর সেই মাথা এবং অন্য সবাইকে ইয়াজিদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইয়াজিদ ও হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বিচ্ছিন্ন মাথার মুখে লাঠি ঢুকিয়ে দেয়। পরবর্তীতে আটকদের মদীনা শরীফে ফেরত পাঠানো হয়।
কারবালায় শহীদদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এক দল ইতিহাস রচয়িতার মতে , পার্শ¦বর্তী গ্রামবাসী হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) সহ অন্যান্য শহীদদের কারবালাতেই কবরস্থ করেন। এখানে কবরস্থের অধিকাংশের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছন্ন ছিলো। ইতিহাস রচয়িতাদের একদল মনে করেন, ইয়াজিদ হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর মাথা কারবালায় ফেরত পাঠালে তা শরীরের সঙ্গে কবরস্থ করা হয়। অন্যদের মতে এই মাথা মদীনাসহ অন্তত সাতটি পৃথক স্থানে কবরস্থ করা হয়। শিয়া সম্প্রদায়ের বিশ^াস মর্হরমের ১০ তারিখে শাহাদত বরণকারী হজরত ইমাম হোসাইন (রা,) এর পবিত্র মাথা ৪০ দিন পর কারবালায় ফেরত আনা হয় এবং দেহের সঙ্গে যুক্ত করে পুনরায় কবরস্থ করা হয়। তাই শিয়া সম্প্রদায় আশুরা উপলক্ষে ৪০ দিন শোক পালন করে থাকে। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব