সাংবাদিকতার চার যুগ -১০

–এবাদত আলী

সংবাদ পত্র বা খবরের কাগজে লিখি। নিউজ লিখি, ফিচার লিখি। মাঝে মধ্যে আমার লেখা ছোট গল্প-কবিতাও পত্রিকায় পাঠাই। কোনটা ছাপা হয় আবার কোনটা হয়না। ছাপা হলে খুব ভালো লাগে। পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে মনে মনে ধন্যবাদ জানাই। পক্ষান্তরে নিজেকে হিরো হিরো মনে হয়। কিন্তুু পত্রিকার পাতায় ছাপা না হলে নিজেকে কেমন যেন অসহায় মনে হয়। তবু লিখি। নিউজ লিখি। ফিচার লিখি। আমার লেখা নিউজ ও ফিচার পত্রিকায় প্রকাশ না হলেও তখন আমার কাছে সে সবের মূল্য ছিলো অনেক বেশি। তখন ভাবতাম চেষ্টা করতে করতেই এক দিন হয়ে যাবে। কেউ তো আর এক লাফে গাছের মগ ডালে চড়তে পারেনা। ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিমল মিত্র বলেছেন “লেখকদের ধৈর্য হারাতে নেই।” আমি এই কথার উপর পূর্ন আস্থা রেখে তাই লেখা লেখি চালিয়ে যেতে থাকি। আসলে একজন সাংবদিক ও লেখক হতে গেলে অত্যাধিক জ্ঞানের অধিকারি হতে হয়। মনে মনে ভাবি সংবাদ ও ফিচার লেখার জন্য যতটুকু জ্ঞানের প্রয়োজন হয়তো সেটুকুন জ্ঞান মহান আল্লাহ পাক আমাকে দিয়েছেন।
কারণ সংবাদ বলতে আমরা আমাদের চারপাশে যেসকল ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে তাকে বুঝে থাকি। শুধু ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। সে ঘটনাকে বিশেষ আঙ্গিকে সাজিয়ে তা যখন কোন পত্র-পত্রিকাতে প্রেরণ করা হয় এবং তা যদি পত্রিকার পাতায় প্রকাশ পায় তখন সে সংবাদ সত্যিকারে সংবাদ হয়ে দেখা দেয়। সংবাদ সে সংবাদই। তা বৈচিত্র পূর্ণই হোক আর বৈচিত্রহীনই হোকনা কেন। কোন কোন সংবাদ পাঠকগণের কাছে বৈচিত্র আনতে সক্ষম নয় সেহেতু তা অনেক সময় পাঠক সমাজ অবহেলার চোখে দেখে থাকেন। আবার কোন কোন ধরণের এমন কিছু সংবাদ আছে যা খবরের কাগজের পাঠকেরা লুফে নেন। সংবাদপত্রের ভাষায় এধরণের কিছু কিছু সংবাদকে হটকেক বলা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের সাংবাদিকগণ বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় আমরা যারা সাংবাদিকতা করি তারা যে আঙ্গিকে সংবাদ সংগ্রহ করে থাকি এবং তা সাজিয়ে গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করে পত্রিকা অফিসে পাঠাই এখানে আমি সে প্রসঙ্গেই আলাপ করছি:-
আমাদের সমাজ জীবনে সমস্যা প্রচুর। এখানে নানা প্রতিকুলতার মাঝ দিয়ে আমাদেরকে চলতে হয়। তাই সংবাদ বা খবরের সুত্র যে কোন সময় হাতের নাগালের মধ্যে পাওয়া খুবই সহজ। কথায় বলে কুসংবাদ বাতাসের আগে ধায়। কথাটি আসলেও সঠিক। কোন স্থানে কোন অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা কিংবা রটনা হলেই তা মানুষের মুখে মুখে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
আমাদের সমাজে কোথাও কোন অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা ঘটলেই তা শোনার পর কিংবা উক্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর ঐ ব্যক্তি ঘটনাটি দ্রুত অন্যের নিকট ব্যক্ত করতে পারলে তৃপ্তি লাভ করে আর না পারলে যেন তার পেট ফুলে যাবার জোগাড় হয়। সংবাদ বাহক তখন ঘটনা সম্পর্কে কোন বাছ-বিচার কিংবা সত্য-মিথ্যার তোয়াক্কা করেনা। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাছে কিংবা সংবাদপত্রের বেলায় যে কোন খবরই খবর নয়। যেকোন ঘটনাই পত্রিকার পাতায় সংবাদ বা খবর হিসেবে স্থান পায়না। এক্ষেত্রে কিছু নিয়ম নীতি মেনে চলতে হয়। একবার আমার বাসায় আমাদের এক পোষা ছাগি একসঙ্গে তিনটি বাচ্চা প্রসব করে। তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়–য়া আমার মেঝ ছেলে ফয়সাল মাহমুদ পল্লব বলে যে আব্বু এই খবরটি আপনি পেপারে দিবেন তাহলে লোকে জানতে পারবে যে, আমাদের ছাগলের তিনটি বাচ্চা হয়েছে। বয়স ও চিন্তা শক্তির আলোকে তার নিকট সেটি পত্রিকার খবর হলেও সংবাদ পত্রের ক্ষেত্রে সেটা কোন খবরই নয়্ । সংবাদটি পাঠক সমাজের কাছে তুলে ধরা যাবে কিনা এবিষয়ে ষ্পষ্টাস্পষ্টি ধারণা থাকা চাই। পাঠক সমাজের কাছে কিভাবে কোন আঙ্গিকে তুলে ধরলে কেমন হৃদয়গ্রাহি হবে তার বাছ-বিচার করতে হয়। এছাড়া সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকে। মিথ্যা বা ভিত্তিহীন কোন সংবাদ যা নাকি গুজব হিসেবে মানুষের মাঝে ছড়ায় তা খবর হলেও খবরের কাগজের পাতায় তার কোন স্থান নেই।
সাংবাদিকতা বা সংবাদপত্রের নীতিমালায় তা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। এক্ষেত্রে সংবাদ বা খবর পরিবেশনে কোন ব্যক্তিই হোক আর কোন সংবাদ সংস্থাই হোক তাদেরকে এধরেণের নিয়ম-নীতি অবশ্যই মেনে চলতে হয়। ভিত্তিহীন ভুয়া ও মনগড়া সংবাদ পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হলে শুধু পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশেরই মান যায়না, সংশ্লিষ্ট এলাকার সাংবাদিকের প্রাণ যাবারও যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। তাই সংবাদের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন তাহলো সংবাদের সত্যতা।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশে শহর সভ্যতা আজো গড়ে ওঠেনি। তাই শহর বা নগর সভ্যতার উপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে সাংবাদিকগণ সংবাদ পরিবেশন করে সামাজিক তথা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এক বিশেষ অবদান রখে চলেছেন। প্রকৃতপক্ষে একজন সংবাদকর্মি বা সাংবাদিক হতে গেলে তাকে অনেক তত্বজ্ঞানের অধিকারি হতে হয়। তথ্য উদঘাটনে পারদর্শী ও বিচক্ষণ হতে হয়। সেকারণে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে প্রদত্ত ডিগ্রির। কিন্তু আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসকল সংবাদকর্মি বা সাংবাদিক রয়েছেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজম করা না থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের মধ্যে অনেকেই এসম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারি।
এ প্রসঙ্গে একথা বলা যায় যে, ৪০ এর দশকেও এদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শিশু জন্ম লাভের পর মায়েরা বাঁশের “চোঁচ” দিয়ে সন্তানের নাড়ি কাটতেন। আজকের বিজ্ঞানের যুগে যা নাকি একেবারেই বেমানান। তখনকার দিনে প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ না থাক, সন্তানকে তো আর মায়ের ফুলের নাড়ির সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা যাবেনা। পৃথিভুমে পদার্পণকারি সন্তানের নাড়ি কাটতেই হবে। কাটা চাই। নইলে মাতা ও সন্তান উভয়েরই যে নিশ্চিত মৃত্যু ঘটবে। আমাদের মত যারা সংবাদকর্মি বা সাংবাদিক তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্ণালিজম করা নেই বটে কিন্তু সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে আমরা যে ভূমিকা রেখে চলেছি তা মোটেই ফেলনা নয়। একে কোন অবস্থাতেই অবহেলার চোখে দেখা সমীচিন নয়। হয়তো বা গ্রামীণ প্রবাদ বাক্যের আদলে আমরা মফস্বল এলাকার সাংবাদিকরা নাচতে নাচতে নাচুনি এবং গাইতে গাইতে গায়েনি। আমরা যারা মফস্বল এলাকায় সাংবাদিকতা করি তাদের মধ্যে অনেকেই যেন নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়াই।।(ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব