সাংবাদিকতার চার যুগ -৯

এবাদত আলী

কেউ কেউ আবার প্রেসক্লাবে গিয়ে পত্রিকার খোঁজ করতেন। এমনি অবস্থার মধ্যে চলতে চলতে একদিন আটঘরিয়া থানার সার্কেল অফিসার (ডেভ) হাবিবুর রহমান আমাকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে জরুরি খবর পাঠালেন। আমি তাঁর অফিসে গেলে এক ভদ্র লোকের সঙ্গে আমায় পরিচয় করিয়ে দিয়ে বল্লেন ইনি রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রতœ নিদর্শন সংগ্রাহক আব্দুস সামাদ মন্ডল। তাঁর সঙ্গে আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে সিও ডেভ একখানা চিঠি আমার হাতে দিয়ে বল্লেন, ইনাকে আমার কাছে এইজন্য পাঠানো হয়েছে। ২৩/০৩/৭৯ তারিখের নং ডি আর এম/ ৪-৮/৪৫৫ নম্বর স্মারকের উক্ত চিঠিটি লিখেছেন মুখলেসুর রহমান এম এ পিএইচডি (লন্ডন) এফ আর এ এস। তিনি লিখেছেন, জনাব পত্রিকা মারফত জানা গেল আটঘরিয়া গ্রামের একটি অট্রালিকার ধবংসাবশেষ হইতে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময়কার আরবি অক্ষরে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপি পাওয়া গিয়াছে। উক্ত শিলালিপির গুরুত্ব অপরিসীম বিধায় গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য সেটি আমরা অত্র মিউজিয়ামে লইয়া আসিতে চাই। আপনি শিলালিপি প্রাপ্ত ব্যক্তিদের সম্মত করাইয়া উক্ত শিলালিপিটি অত্র মিউজিয়ামে দান করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে বিশেষ বাধিত হইব। ৭০ বছর পূর্বে যে উদ্দেশ্যে এই মিউজিয়াম স্থাপিত হইয়াছিল তাহা সার্থক হইবে। আশা করি আপনার সাহায্য পাইব। পত্রের উত্তর আশা করি। চিঠি পড়ার পর বিষয়টি আমার নিকট পরিষ্কার হয়ে গেলো। কারণ কয়েকদিন আগেই আমরা এ বিষয়ে নিউজ করেছিলাম। তবে ঘটনাটি আটঘরিয়ায় নয়, পাবনা সদর থানার মালিগাছা ইউনিয়নের বড় মাটিয়াবাড়ি গ্রামে।
বড় মাটিয়াবাড়ি গ্রামের ৪ একর ৪৪ শতাংশ জমি জুড়ে একটি বিশাল দিঘী। সেই দিঘীর পাড়ে প্রাচীন মসজিদ। মসজিদের মেহরাবের নমুনা হিসেবে আরবি অক্ষরে পাথরে খোদাই করা একটি শিলালিপি কয়েকদিন আগে পাওয়া যায়। আর এই শিলালিপিকে কেন্দ্র করে নানা ধরণের কিংবদন্তি, গুজব ও আলোচনা সমালোচনার ঝড় ওঠে। আমরা উক্ত শিলালিপির খবর পত্রিকাতে পাঠাই। তারই সুত্র ধরে আব্দুস সামাদ মন্ডলকে এখানে পাঠানো হয়েছে।
আমি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে সাংবাদিক এইচকেএম আবু বকর সিদ্দিকের দোকান টেবুনিয়াতে আসি। সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম রাঙা, সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস সাগর ও আরো দুএকজনকে খবর দেয়া হয়। আমরা সকলে মিলে সেই শিলালিপির উদ্দেশ্যে রওনা হই। এলাকার জনসাধারণের নিকট হতে জানা যায়, বড়মাটিয়াবাড়ির দিঘির পাড় নামক স্থানটি বহু বছর যাবত ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিলো। বৃহৎ এই দিঘিতে ধাপ, দাম বা কচুরিপানা দ্বারা এমনভাবে পরিবেষ্টিত ছিলো যে, পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে কোথাও পানির লেশমাত্র চোখে পড়তোনা। কচুরিপানার উপর লতাগুল্ম পরিপূর্ণ ছিলো। গরু-মহিষ অবাধে তার উপর চড়ে কচুরি পানা ও লতাপাতা খেতো। মাত্র ক’বছর আগেও বড়মাটিয়াবাড়ি গ্রামটি জনশুন্য ছিলো। এমনকি আশেপাশে কোথাও বাড়ি-ঘর ছিলোনা। পরবর্তীকালে খন্দকার আশরাফ আলী নামক এক ব্যক্তি বসবাস শুরু করলে নতুন করে বসতি গড়ে ওঠে। এলাকার লোকজন কয়েক বছর ধরে পরিশ্রম করে দিঘিটি জঙ্গল মুক্ত করলেও তা একেবারে পরিষ্কার করা সম্ভব হয়না। তখনো পর্যন্ত কেউ দিঘির পানিতে গোসল করতোনা এবং গরু-ছাগলকেও পানি পান করাতোনা। কারণ এই দিঘিকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের কিংবদন্তি ছিলো। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে যে, বহু বছর আগে এই এলাকার এক হিন্দু রাজা প্রজাদের পানির কষ্ট নিবারণের জন্য একটি বিরাটকায় দিঘি খনন করেন। দিঘির খনন কাজ শেষ হলেও তাতে বিন্দুমাত্র পানি পাওয়া যায়না। উক্ত রাজা তখন জ্যোতিষি ডেকে পরামর্শ চাইলেন। জ্যোতিষি জানায় যে, যদি একজোড়া কচি শিশুকে বলি দেয়া যায় তবেই পানি উঠবে নচেৎ নয়। প্রতাপশালি রাজা সেই কাজই করলেন। একজোড়া শিশুকে পুকুরের মাঝখানে বলি দিতেই দিঘিটি পানিতে পরিপুর্ণ হয়ে যায়। তাই গভীর রাতে নাকি ঐ দিঘির মাঝখান হতে কান্নকাটির করুন সুর ভেসে আসতো। কেউ কেউ বলে থাকে বহুকাল আগে এলাকাটি মুসলমানদের দখলে ছিলো এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারের একটি প্রাণকেন্দ্র ছিলো। তখনই এখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীকালে দিঘি খনন কালে মসজিদটি মাটির নিচে চাপা পড়ে। কিংবদন্তি যাই থাকুক তার উপর নির্ভর না করে উক্ত দিঘির পাড়ের মাটির ঢিবির নিচে মসজিদের ধ্বংসাবশেষের মধ্য হতে যে শিলালিপিটি পাওয়া যায় সে সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে বলা যায় স্থানটির গুরুত্ব অপরিসীম। উক্ত দিঘির পাড়ে বসবাসরত লোকজন পাড়ের ঘন বন-জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা পর পর দু’টি দালানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়। দিঘির পাড়ে বসবাসকারি খন্দকার আশরাফ আলী ও আব্দুল কাদের মিয়া জানান পাথরে খোদাই করে আরবি হরফের লেখা পাঠোদ্ধারের কোন লোক এলাকায় পাওয়া যায়না।
অবশেষে পাথর খন্ডটি ধুয়ে মুছে তেলের প্রলেপ দিতেই হাজাল মসজিদ আরবী কয়েকটি অক্ষর বুঝা গেল।
প্রস্তর খন্ডের গায়ে আরবী হরফে যা লিপিবদ্ধ ছিলো তা এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো।
“হাজাল মসজিদ ফি আহদিস সুলতানিল আজমিল আদলে-হাফেজু বিলাদিল্লাহে নাছেরো- এবাদিল্লাহে গীয়াস উদ-দুনিয়া ওয়াদ্দিনে-আবু মোজাফ্ফর মাহমুদ শাহ বিন হুসাইন শাহ সুলতান খাল্লা দাল্লাহু-তায়ালা মূলকাহু ওয়া সুলতানাহু খায়রান জালিলুল মূলক বিন আফজালুল মূলক শাহরানে ছালাছিনা আরবাউ তেসআতুন।” যার অর্থ হলো:- আরবী ৯৩৪ হিজরী সনে আলাউদ্দিন হুসাইন শাহের পুত্র মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিলো।
এই শিলালিপির কাছে আমরা যাবার পর এলাকার লোকজন দলে দলে ছুটে আসতে থাকে। তারা বেশি কৌতুহলি হলো যখন জানতে পারলো যে, এই শিলালিপিটি রাজশাহী জাদু ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে। হয়তো বা এতদিন পরে তারা উপলব্ধি করলো যে তারা কত মূল্যবান জিনিষই না মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করেছে। শিলালিপি রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘরে নেওয়ার প্রস্তাব দিতেই নানা প্রকার প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হলো। গ্রামবাসি দাবি করে বসলো যে, তাদের এই মূল্যবান পাথরটি নিয়ে যেতে হলে যে মজিদের মেহরাব হতে এটি পাওয়া গেছে সেই মসজিদ পাকা করে দিতে হবে। নচেৎ অতি পবিত্র পাথরটি দেওয়া হবেনা। লে হালুয়া। বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে আলাপ আলোচনা করে কোন ফল হলোনা। অবশেষে আমাদের মধ্যস্ততায়ও কোন কাজ হলোনা। এক পর্যায়ে এলাকাবাসি মসজিদ পাকা করার বদলে দশ হাজার টাকা দাবি করে বসলো। অগত্যা নিরূপায় হয়ে প্রতœ নিদর্শন সংগ্রাহক আব্দুস সাাদ মন্ডলকে শুন্য হাতে রাজশাহী ফিরে যেতে হলো।
এঘটনার কিছু দিন পর ঢাকা জাতীয় জাদুঘর থেকে সহকারি কীপার নিজামুদ্দিন এসে হাজির হলেন। তিনি লোক মারফৎ খবর নিয়ে আমার এবং এইচকেএম আবু বকর সিদ্দিকের শরনাপন্ন হলেন। আমরা তাঁকে রাজশাহী মিউজিয়ামের প্রতœ নিদর্শন সংগ্রাহকের বিষয়টি খোলা-মেলাভাবে বল্লাম। কিন্তু তিনি নাছোড় বান্দা। শুধুমাত্র ভদ্রতা রক্ষার খাতিরে তাঁর সঙ্গে পুনরায় আমরা সেখানে গেলাম। দিঘির পশ্চিম পাড়ের বাসিন্দা আমাদের সুহৃদ আব্দুল কাদের মিয়ার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। তিনি আমাদেরকে সিমাই ও পরেটা নাস্তা খেতে দিলেন। তাঁর আতিথেয়তা পাওয়া গেলেও শিলালিপির ধারে কাছেও যাওয়া সম্ভব হলোনা। কারণ এবার রাজধানী ঢাকা থেকে পাথর নেওয়ার জন্য লোক এসেছে। একি যে সে কথা। তাই কালো পাথরটির কদর আরো কয়েকগুন বেড়ে গেল। আর আমরা সাংবাদিকরা এলাকাবাসির কাছে আরো খারাপ হয়ে গেলাম। ভাব খানা এমন, সাংবাদিকরা যেন তাদের বাড়া ভাতে ছাই দিতে এসেছে। এবার শিলালিপিটির মূল্য দ্বিগুন হাঁকা হলো। নিরূপায় হয়ে কীপার নিজামদ্দিন পাবনা জেলা প্রশাসকের শরণাপন্ন হন।
এদিকে রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে শিলালিপিটি নিয়ে যাবার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। এই শিলালিপি নিয়ে এলাকার মানুষেরা মিটিং বসায়। কোন অবস্থাতেই শিলালিপিটি হাতছাড়া করা যাবেনা। ঢাকা জতীয় জাদুঘরের পক্ষ থেকে সেখানে নিয়ে যাবার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের পক্ষ থেকে বলা হয় এটা উত্তরবঙ্গের সম্পদ তাই উত্তর বঙ্গের জাদুঘরই এর হকদার বটে। এইভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একদিন পাবনা জেলা প্রশাসক এম এ জব্বার পুলিশ ফোর্স পাঠিয়ে শিলালিপিটি জেলা প্রশাসকের তোষাখানায় নিয়ে যান। বিনিময়ে বড়মাটিয়াবাড়ির লোকজন একটি কানাকড়িও লাভ করতে পারেননা।
দীর্ঘ দিন ধরে লেখালেখির পর শিলালিপিটি রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে প্রদানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ এলে পাবনার জেলা প্রশাসক তা রাজশাহী মিউজিয়ামে পাঠান। অবশেষে ৯৩৪ হিজরী সনের শিলালিপিটি রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামেই নিজেকে স্থান করে নেয়। এখনো তা সেখানেই রয়েছে। (ক্রমশঃ)। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখ: ০২/০৬/২০২৫.