–এবাদত আলী
(পুর্ব প্রকাশের পর)
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রিয় কমিটির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য সমিতির সাধারণ সম্পাদক বদিউর রহমান আমাদের জন্য অর্ধেক ভাড়ায় ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করে চিঠি লিখে পাঠালেন। সেমতে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি আটঘরিয়া শাখার সভাপতি হিসেবে আমি এবাদত আলী, সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম রাঙা, সদস্য এইচকেএম আবু বকর সিদ্দিক, মোহ্মাদ ইয়াছিন, আব্দুস সাত্তার মিয়া, এস দাহার মাতলু, হাসান আলী, পাবনা জেলা শাখার সদস্য আ.জ.ম. আব্দুল আউয়াল খান, আব্দুল কুদ্দুস চাঁদুসহ আরো অনেকে ঈশ্বরদী রেল ষ্টেশনে গিয়ে অর্ধেক ভাড়ায় ঈশ্বরদী থেকে ঢাকা পর্যন্ত টিকিট কেটে ট্রেনে উঠলাম। রাতের বেলা ট্রেনে চেপে ভোরে সিরাজগঞ্জ গিয়ে পৌছলাম। সেখান থেকে আমরা গেলাম দৈনিক সংবাদের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি আব্দুল কুদ্দুস ভাইয়ের বাসায়। আমাদেরকে পেয়ে তিনি খুবই খুশি হলেন। এরপর সিরাজগঞ্জের অনেক সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গেই সাক্ষাৎ ও আলাপ পরিচয় হলো। আমরা সকলে মিলে সিরাজগঞ্জ স্টিমার ঘাটে গেলাম। এখান থেকেই স্টিমারে চেপে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে জগনাথগঞ্জ ঘাটে যেতে হবে।
১৯১০ সালে ইশ্বরদী-সিরাজগঞ্জঘাট রেলপথ এবং সিরাজগঞ্জ স্টিমার ঘাট চালু হয়। তখন থেকে ইশ্বরদী হতে ট্রেন এসে থামে সিরাজগঞ্জ ঘাটে। এরপর রেলওয়ে ফেরিতে করে যাত্রি ও মালামাল পারাপার করা হয় যমুনা নদীর ওপারে জগনাথগঞ্জ ঘাটে। সেখান থেকে পুনরায় ট্রেনে করে যাত্রি ও মালামাল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আমরা ঘাটে গিয়ে অপর একটি ট্রেনের আগমণের জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কারণ ঈশ্বরদী থেকে আরেকটি ট্রেন না আসা পর্যন্ত ঘাটে অপেক্ষমান রেলওয়ে স্টিমার কিছুতেই ছাড়বেনা। একসময় ট্রেন এলো। আমরা আগেভাগেই স্টিমারের ক্যাবিনে উঠে বসেছিলাম। তাই স্টিমারে চড়ার জন্য কোন হুড়াহুড়ি করতে হলোনা। দেখতে দেখতে যাত্রিদের ভিড়ে স্টিমারের খোলস ভর্তি হয়ে গেলো। একসময় বিকট শব্দে সিটি বাজিয়ে স্টিমার ছেড়ে দেয়া হলো। উপরে প্রখর সুর্যতাপে দগদগে আকাশ। ক্যাবিনে জলীয় বাষ্পে ভরা মৃদু শীতল বাতাস। সামনে বিস্তীর্ণ দিগন্তরেখা। নিচে যবুনা বা যমুনার বিশাল জলরাশি। স্রোতের দোলায় সাঁতার কেটে যেন দুলতে দুলতে পথ চলা। দারুন মোহনীয় এক্ষণ। ব্রহ্মপুত্র নদের প্রধান অববাহিকা খরস্রোতা রাক্ষুসি ও সাতিশয় বেগবতি এবং ভাঙনশিলা হিসেবে সমধিক পরিচিত এই যমুনা নদী। হিন্দু বিশ্বাস মতে এককালে শ্রীকৃঞ্চ ও রাধিকার প্রেমলিলা নিকেতন ছিলো এই যমুনা। বর্ষাকাল ব্যতীত এই নদীর পানি নীলাভ দেখা যাওয়ায় সেকালে ইংরেজ সাহেবগণ এই নদীর নাম দিয়েছিলেন বুলু রিভার। যাক আমরা একসময় যমুনা নদী পার হয়ে জগনাথগঞ্জ স্টিমার ঘাটে গিয়ে পেীঁছলাম। অবর্ননীয় দুঃখ-দুর্দশা এতক্ষণ যেন শুধু আমাদের জন্যই ওৎ পেতে বসেছিলো। স্টিমার থেকে নামার পরপরই মিনি ম্যারাথন দৌড়ের প্রতিযোগিতা শুরু হলো। তাও আবার ধুধু বালুকণার মধ্য দিয়ে। এই প্রতিযোগিতা শুধু ট্রেনের কামরায় একটি সিট পাওয়ার জন্য। জগনাথগঞ্জ ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে একটি ট্রেন। সকলেরই লক্ষস্থল সেই ট্রেন। আগে যেতে পারলে তবেই সিট পাওয়া যাবে-নচেৎ দু পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে ট্রাফিকের ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে যেতে হবে। আমাদের সঙ্গে কোন ভারি লাগেজপত্র ছিলোনা বলে রক্ষে নচেৎ কি যে হতো তা ভাবতেই দম বন্ধ হবার উপক্রম। যাদের সঙ্গে ভারি লাগেজপত্র, শিশু সন্তান কিংবা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, তাদের অবস্থা বর্ণনা না করাই ভালো। আর রোগি সঙ্গে থাকলেতো মরার উপর খাঁড়ার ঘা। যাক আমরা সহি সালামতে জগনাথগঞ্জ ঘাটে দন্ডায়মান ট্রেনের কামরায় গিয়ে বসলাম। ট্রেন সরিষাবাড়ি হয়ে জামালপুর রেলওয়ে জংশন এবং সেখান থেকে ময়মনসিংহ জংশনে গিয়ে পৌঁছলো। ময়মনসিংহ হতে ট্রেন বদল করে ঢাকাগামি ট্রেনে চেপে একসময় আমরা ঢাকার ফুলবাড়ি রেল ষ্টেশনে গিয়ে পৌঁছলাম। স্টেশন থেকে রিকসা যোগে অগত্যা নবাবপুর রোডের একটি হোটেলে গিয়ে উঠলাম।
পরদিন বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও নির্বাচন। ঢাকা জেলা ক্রিড়া সমিতি মিলনায়তনে ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান। কিন্তু তিনি উপস্থিত না হয়ে তথ্যমন্ত্রী আনোয়ার জাহিদকে পাঠালেন। তথ্যমন্ত্রী সম্মেলনের উদ্বোধন করলেন এবং ভাষণ দিয়ে জরুরি কাজের কথা বলে চলে গেলেন। সম্মেলনে কেন্দ্রিয় ও জেলার নেতৃবৃন্দ জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিলেন। দুপুরের খাবার শেষে দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এতে সফি উদ্দিন আহমেদ সভাপতি এবং বদিউর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। সম্মেলন শেষে আমরা আবার ট্রেন পথেই বাড়ি ফিরে আসি।
সাংবাদিক হিসেবে ইতোমধ্যে আমাদের বেশ পরিচিতি ঘটেছে। আমরাও এলাকার বিভিন্ন ঘটে যাওয়া ঘটনা, অভিযোগ সমূহ এবং এলাকার সমস্যাবলি অতি গুরুত্বসহকারে পত্র-পত্রিকার পাতায় তুলে ধরতে থাকি। তবে আমাদের পাঠানো খবর পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হলেও এলাকার সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যেতো। কারণ সেসকল পত্রিকার একটি কপিও এলাকায় আসতোনা। যে সাংবাদিক যে পত্রিকায় খবর পাঠাতেন সেই সকল সাংবাদিকদের নিকট ডাক যোগে কেবল সৌজন্য কপি পাঠানো হতো। অর্থাৎ ভাবখানা যেন এমনি ‘ মামারাই রাঁধে-বাড়ে মামারাই খায়, আমরা গেলে মামারা ঘরে দোর দেয়’ এই প্রবাদ বাক্যের মতই যেন অবস্থা। কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন খবর প্রকাশিত হলে তা জানতো কেবল এলাকার সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা। এছাড়া আর কারো জানার উপায় ছিলোনা। তবে কোন কোন সাংবাদিক এলাকার লোকজনের কাছে গল্প করতেন আর সেকথা চলে যেতো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তা ব্যক্তির নিকট। তিনি তখন হন্যে হয়ে খুঁজতেন সেই সকল পত্রিকা।
কেউ কেউ আবার প্রেসক্লাবে গিয়ে পত্রিকার খোঁজ করতেন। (ক্রমশঃ)। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ:২৭ /০৫/২০২৫.
