-এবাদত আলী-
প্রেম অবিনশ্বর। মানব আত্মায় প্রেম জন্ম থেকে জন্মান্তরের। তাই মানবিক গুনাবলীতে নিহীত রয়েছে এর নিগুঢ় তত্ব। প্রেম বা ভালোবাসার কোন মৃত্যু নেই। যুগে যুগে শুধু রয়েছে এর বিকাশ। একে অপরের মাঝে আত্মার এক বন্ধনে প্রেম বা ভালোবাসা অমরত্ব লাভ করে থাকে। প্রেমে আছে মিলন প্রেমে আছে বিরহ। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাই তার কবিতায় প্রস্ফুটিত করে তুলেছেন তার জীবনের আবেগ গাথা প্রেম।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুলতঃ বিদ্রোহী কবি। কিন্তু তার সুকঠিন কবিতা চর্চার মাঝেও শান্ত প্রেমের অভিব্যক্তিকে উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই তিনি লিখেছেন ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।’ কবি নজরুলের প্রেমের কবিতায় হৃদয়াবেগের তীব্রতা অতিমাত্রায় প্রকটিত। কবি নজরুল প্রকৃতি পরিবেশ ও পৃথিবীকে মায়াজালের পরশে অপূর্ণ করে তুলেছেন। তার প্রেমের কবিতাগুলোর প্রকৃতি বিচার করে নজরুল মানসে প্রেমের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। ‘সিন্ধু হিল্লোল’ কাব্যগ্রন্থে প্রেমের সুগভীর নিবিড়তা চিরন্তনতা এবং বিচ্ছেদের তীব্র জ¦ালার প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। সিন্ধুর অশান্ত রূপ কবি চিত্তের বিচ্ছেদ জ¦ালা পথিকের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ‘ এক জ¦ালা ব্যথা নিয়া তুমি কাঁদ আমি কাঁদি, কাঁদে মোর প্রিয়া’।’ নারীর দৃষ্টিতে থাকে দহন দীপ্তি, যা জ্ঞান ও শিল্পের প্রেরণা। তাই কবিতার বিষয় হিসেবে প্রেম এবং আধার হিসেবে নারী যুগ হতে যুগান্তরে, দেশ হতে দেশান্তরে সমাদৃত ও ধৃত। নজরুলের কন্ঠেও সর্বজনীন সত্য উচ্চারিত-‘ নারীর বিরহে নারীর মিলনে নর পেল কবি প্রাণ, যত কথা তার হইল কবিতা শব্দ হইল গান।’ (সর্বহারা)।
বিরোহের বেদনাই প্রেম। নজরুল ইসলামের কবিতায় নিত্যকালের নর-নারীর বিরোহী প্রাণের অশেষ কান্না ধ্বনিত হয়েছে। চির চাওয়া প্রেমের পরিণত হলো বিচ্ছেদ। তবু মানুষ তাকেই সংবেদনশীলতা এবং অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে লালন করে। কবি নজরুল বলেছেন, ‘দুরের প্রিয়া পাইনি তোমায় তাই এ কাঁদা রোল। ’(গোপন প্রিয়া)। প্রেমকে দৈহিক বৃত্তি না জেনে তাকে বিষ্ময় বেদনা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করায় তার কবিতায় প্রেমানুভুতি গভীরতা পেয়েছে। প্রেমিক চিরদিন অতৃপ্তি ও বেদনা নীরবে নিভৃতে বহন করে চলে। কবির বেদনা হয়েছে বিশ^গত ‘ এপারে ওপারে মোরা , নাই নাই কুল/ তুমি দাও আঁখি জল , আমি দেই ফুল।’ কবির বেদনার সঙ্গি বাদল রাতের পাখি, কবি তাকে বলেন,- বাদল রাতের পাখি উড়ে চলে যথা- আজো ঝরে জল, নাহিকো কুলের ফাঁকি।’ নজরুল প্রেমের কবি হিসেবে বাংলা রোমান্টিক গীতি কাব্য ধারায় অমর হয়ে আছেন। কবি বিরহকে কবি সত্বার মৈাল ব্রত, পরম প্রেরণা হিসেবে আবিষ্কার করেছেন। তিনি সব হারালেও হৃদয় হতে তার প্রেমকে , প্রিয়াকে হারাতে চাননি। তাই প্রিয়া তার নিত্যকালের। প্রিয়ার কাছ থেকে প্রেম না পেলেও বলেছেন-,
‘নাইবা পেলাম কন্ঠে আমার তোমার কন্ঠ হার
তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহংকার।’ কবি মানবীয় কামনাকে বিচিত্র রেখাঙ্কনে ও লীলা ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন,-‘ প্রিয় এবার সঁপে দিলাম তোমার চরন তলে, তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।’ (সমর্পন, দোলন চাঁপা) নারীর প্রেমে আত্মসমর্পন করেছেন নিজেকে ধরা দিয়েছেন,- ‘ হে মোর রাণী, তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে
আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরনতলে এসে।’
প্রকৃতি প্রেমি নজরুল প্রেমের বলয়ে তাই প্রিয়াকে আহ্বান করেছেন অতি সাদাসিধে ভাবে
‘‘ মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী
দেবো খোপায় তারার ফুল,
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতি চাঁদের দুল,
কন্ঠে তোমার পরাবো বালিকা,
হংস সারির দুলানো মালিকা- …
আমার গানের সাত সুর দিয়া
তোমার বাসর রচিব প্রিয়া
তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুল বুল।’’
প্রেম মানবাত্মার এক গভীরতম ক্ষুধা যে ক্ষুধা নিবৃত্ত হয় একমাত্র পেমাস্পদের সঙ্গে মিলনে যৌন কামনাকে ভিত্তি করে জাগতিক প্রেমের জন্ম। প্রেমের প্রতিবন্ধকতায় সৃষ্টি হয় বেদনা, বিষাদ, নৈরাশ্য। প্রেমের কবিতার জšম এখানেই। বিরোহের বেদনাই প্রেম। নজরুলের কবিতায় নিত্যকালের নর-নারীর বিরোহী প্রাণের অশেষ কান্নায় ধ্বনিত হয়ে ফেরে
-‘ আবার কখন আসবে ফিরে সেই আশাতে জাগব রাত
হয়তো সে কোন নিশুত রাতে ডাকবে এসে অকস্মাৎ!
সেই আশাতে জাগব রাত।
যতই কেন বেড়াও ঘুরে
মরণ-বনের গহন জুড়ে
দুর সুদুরে
কাঁদলে আমি আসবে ছুটে, রইতে দুরে নারবে নাথ
সেই আশাতে জাগব রাত।’’ (আশাম্বিতা) ।
তোমারে পড়িছে মনে কবিতায় কবির অভিব্যক্তি ভাবাবেগ পরিলক্ষিত হয়।
কবিতা- ‘‘ তোমারে পড়িছে মনে
আজি নীপ বালিকার ভীরু-শিহরণে,
যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছল ছল মুখে
কেতকী-বধুর অবগুন্ঠিত ও বুকে
তোমারে পড়িছে মনে। ’’
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম দেহের সঙ্গে আত্মাকে এবং আত্মার সঙ্গে দেহকে টেনে এনে ছেন। বিরোহের তপ্ত আগুনে পুড়ে পুড়ে কবির অশুদ্ধ মন শুদ্ধ হয়েছে। প্রেমের এ অমরত্বে কাজী নজরুলের স্বঘোষিত নীরবতা- ‘‘ তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু
আর আমি জাগিবনা,
কোলাহল করি সারা দিনমান
কারো ঘুম ভাঙিবনা।
নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব আমি গন্ধ বিধুর ধূপ।’’
কবি কাজী নজরুল বিদ্রোহী কবি হলেও মূলত প্রেমের কবি ছিলেন। তাঁর প্রেমের কবিতা তাঁকে অমর করে রাখবে। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখ: ২৪/০৫/২০২৫.
