এবাদত আলী
শহরের ভিড়ের মধ্যে ফুটপাতের উপর দিয়ে চলতে গিয়ে আমি পাশের দোকান সমূহের সাইনবোর্ডগুলোর দিকে মনযোগ সহকারে চোখ বুলিয়ে নেই। বলতে গেলে সবগুলো সাইনবোর্ড পড়তে পড়তে পথ চলি। এতে দুএকজন পথচারির সঙ্গে মাঝে মধ্যে ধাক্কা খেয়ে তাদের গালমন্দ শুনি, এইযে ভাই দেখে পথ চলতে পারেননা। কেউ কেউ বলে বেটা অন্ধ নাকি। লোকে যা বলে বলুক। অন্ধ বলে অপবাদ দেয় দিক তাতে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু ফুটপাতের পাশে কোন হেয়ার কাটিং এর সাইনবোর্ড পড়তে আমার কখনো ভুল হয়না।
ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে যেমন ভয় পায় আমিও ফুটপাত দিয়ে পথ চলতে গিয়ে কোন হেয়ার কাটিং সেলুন অতিক্রম করতে ঠিক তেমনি ভয় পেয়ে থাকি। সেলুন ভীতি আমার দেহে যেন চমক জ্বর বয়। উহ! সে কথা মনে হলে আমার শরীর হিম হয়ে আসে। সজারুর কাঁটার মত আমার গায়ের লোম গুলো খাড়া হয়ে ওঠে। তখন লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করে। ঘটনাটি ঘটেছিলো আমার বিয়ের প্রথম বছরে। নতুন জামাই হিসেবে সেবার শশুর বাড়িতে ঈদ করতে গেলাম। তখন সব কিছতেই যেন নতুন নতুন স্বাদ।
দুপুরের খাবার খেয়ে নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম আর গিন্নির জন্য অধীর আগ্রহে প্রতিক্ষা করছিলাম। খানিক বাদে ঝাঁঝাঁলো পারফিউমের সুবাস ছড়িয়ে গিন্নির বদলে আমার শ্যালিকা ফুলটুনি ঘরে প্রবেশ করে আমার গা ঘেঁষে বসে পড়লো। কোন ভূমিকা না করেই বল্লো দুলাভাই, কুইক রেডি হন। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে পড়বো। শ্যালিকার কথা বুঝে ওঠার আগেই গরদের একটি সাদা পাঞ্জাবী আর সাদা টেট্রনের চোশ্ত পাজামা হাতে গিন্নি এসে বল্লে¬া নাও, এগুলো পরে নাও, মার্কেটে যেতে হবে। আমার চুলে গিন্নি নরম হাতের পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে বল্লো আম্মাও যাবেন আমাদের সঙ্গে। অতীতে বিয়ের কোন পুর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় শাশুড়ী, শ্যালিকা ও গিন্নিকে নিয়ে মার্কেটে যেতে দারুন লজ্জাবোধ হচ্ছিলো। নতুন জামাই তাই প্রতিবাদের সাহস পাচ্ছিলামনা।
গরু-ছাগলকে জবাইয়ের পুর্বমূহুর্তে কসাইরা যেমন টানা হেচড়া করে পিলখানায় নিয়ে যায়, আমার অবস্থাও যেন ঠিক তাই। শাশুড়ী শ্যালিকার সঙ্গে মার্কেটে গেলে আমার পকেট যে গড়ের মাঠ হয়ে যাবে তা ভাবতেই আমার পিলে চমকে উঠলো।
অগত্যা শাশুড়ীর অনুরোধে তাদের পিছু নিতে হলো। রিক্সা যোগে শহরের একটি ঘড়ির দোকানের পাশে গিয়ে রিক্সা বিদায় করা হলো। শাশুড়ী শ্যালিকা ও গিন্নি সোজা দোকানে ঢুকে পড়লো।ততক্ষণে বুঝলাম আমার জন্য উপহার হিসাবে হাতঘড়ি ক্রয় করা হবে। এতক্ষণে আমি শংকামুক্ত হলাম। ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়লো।
দীর্ঘক্ষণ এ দোকান ও দোকান ঘুরা ঘুরি করা হলো। ঘড়ি পছন্দ হলোনা। শাশুড়ীর পছন্দ হয়তো গিন্নির হয়না। গিন্নির হলে শ্যালিকা বলে এটাকি জামাইয়ের হাতের ঘড়ি হলো? এ তো ব্যাক ডেটেড মডেল। দোকান কর্মচারিরা নাছোড় বান্দা। তারা আমার শাশুড়িকে বলে আপা এটা নেন, ভাইয়ার হাতে মানাবে ভালো। আবার গিন্নিকে বলে দেখেন তো আপা এই ডিজাইন পছন্দ হয় কিনা। দোকান কর্মচারিদের কথায় গিন্নি শাশুড়ীসহ আমরা সবাই লজ্জা পাই। শ্যালিকা আমার আঙ্গুলে জোরে জোরে চাপ দেয় আর মুখ টিপে টিপে হাসে। এ দোকান থেকে ওদোকান বেড়াতে বেড়াতে আমার দফা রফা হবার জোগাড়। নতুন জামাই তাই প্রতিবাদ করার সাহস পেলাম না। আমি যেন তখন কলুর বলদের মত হয়ে গেছি।
এমনি ভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটি হেয়ার কাটিং সেলুন বরাবর যেতেই হঠাৎ আমি লাফিয়ে উঠলাম। এক বোগলা গরম কি যেন আমার শরীরের বাম দিকে এসে পড়লো। একবার মাত্র তাকিয়ে দেখলাম আমার গায়ের পাঞ্জাবী লালচে রঙে রঞ্জিত হয়ে গেছে। পাজামা পর্যন্ত তার বিস্তৃতি ঘটেছে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাতের উপর বসে পড়লাম। আমার ডান হাতে ধরা গিন্নির কচি আঙ্গুল ততক্ষণে ফসকে গেছে। উঃ মাগো-কি বিচ্ছিরি একটা শব্দ কানে ভেসে এলো। সেলুন থেকে জনৈক কর্মচারি আমাকে ততক্ষণে ঝাপটে ধরে বার বার ক্ষমা প্রার্থনা করছে। চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসছে। ঘটনা আর কিছুই নয় সেলুনের কর্মচারি জর্দা মাখা পানের এক বোগলা পিক ফেলেছে আমার গায়ের উপর। বিচ্ছিরি উৎকট গন্ধে যেন আমার পিত্ত মোচড় দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। গা ঘিন ঘিন করছে। সেলুনের কর্মচারি ও আরো কয়েকজন ব্যক্তি আমাকে ধরাধরি করে অতি আদরের সঙ্গে সেলুনের মধ্যে নিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আমার গায়ের গেঞ্জি ও পাঞ্জাবী খুলে ফেলা হলো। চুল কাটার সময় খরিদ্দারের গলায় যে কাপড় পেঁচানো হয় তারই একটা আমাকে পরতে দেওয়া হলো। কাপেেড়র সঙ্গে লেগে থাকা ছোট ছোট চুল শরীরের নিম্নাঙ্গে বিঁধতে লাগলো। শাশুড়ী তখন সেলুন কর্মচারির প্রতি মারমুখি। গিন্নির মুখে কোন কথা নেই। শ্যালিকা ফুলটুনি আমার এমন অŸস্থা দেখে হেঁসে তখন লুটো পুটি খাচ্ছে। পথচল্তি লোকজনের মধ্যে কেউ সমবেদনা জানালো কেউ সেলুন কর্মচারিকে মারতে উদ্যত হলো। আবার কেউ কর্মচারির পক্ষ নিয়ে বলতে লাগলো ওর কি দোষ? জর্দা দিয়ে পান খেলে তো পিক ফেলতেই হবে। উনি দেখে শুনে পথ চলতে পারেননি। এ সব কথা শুনে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছিলো।
সেলুনের খরিদ্দার যাদের চুলকাটা কিংবা দাড়ি ছাঁটা হচ্ছিলো তাদের সকলের কাজ অসমাপ্ত রেখে কর্মচারিরা আমার শরীর থেকে পানের পিক ধৌত করার জন্য তাড়া হুড়ো করতে গিয়ে চুল-দাড়ি কামানো ব্রাশ ধোয়া ফেনাযুক্ত পানিই ব্যবহার করতে আরম্ভ করলো। যে কর্মচারি আহম্মকের মত আমার শরীরে পানের পিক ফেলেছিলো সে শুধু হাত জোড় করে চলেছে। মহারাজের নিকট ভৃত্য যেমন ক্ষমা প্রার্থনা করে ঠিক তেমনি। এমন যে ঘটনা ঘটবে তা রাতে কেউ খোয়াবও দেখেনি।
অগত্যা সেলুন কর্মচারিদের দেওয়া ঐ বসন পরেই উদম গায়ে কোন মতে আমি লজ্জাবনত মস্তকে রিক্সায় গিন্নির পাশে গিয়ে বসলাম। রিক্সার পা দানির উপর রাখা গরদের পাঞ্জাবী, পাজামা এবং গেঞ্জি থেকে তখনো জর্দামাখা পানের পিকের বোটকা গন্ধ আমাদের নাকে এসে লাগছিলো। কিছুদুর যেতে না যেতেই গিন্নি গল গল করে বমি করে দিলো। পানের পিক থেকে কোনমতে রেহাই পাওয়া গেলেও গিন্নির উঞ্চ বমি থেকে কিছুতেই রক্ষা পাওয়া গেলনা। ( লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব। তারিখ: ১৭/১০/২০২৬
