যশোরে আজ সাতশ’৪৬ মণ্ডপে ষষ্ঠী তিথির সূচনা দুর্গাপূজায়, নিরাপত্তায় বিজিবি

ইয়ানূর রহমান : হাজারো ভক্তপ্রাণের অপেক্ষার প্রহরের অবসান ঘটিয়ে দেবী দুর্গার আগমন ঘটেছে। আজ শুক্রবার দুর্গোৎসবের ষষ্ঠীবিহীত পূজা। বাঙালী সনাতন ধর্মবিশ্বাসীদের প্রধান ধর্মীয় এ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো আজ থেকে। বেলতলায় দেবীর বোধনের মাধ্যমে ষষ্ঠী তিথির সূচনা। কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহীত পূজার মাধ্যমে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো মন্দিরের মন্ডবে।

পঞ্চমি তিথীর শেষে এবং ষষ্ঠীর শুরুতে বেলতলায় মূলত অকালবোধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণায়নের নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙার জন্য বোধন ঘট স্থাপন ও বন্দনাপূজা করা হয়। বোধন শেষে ষষ্ঠী তিথি থেকে দশহস্তে অস্ত্রে সজ্জিত ত্রিনয়ণী দেবী দুর্গার অতল স্নিগ্ধ চোখের পলক খুলে যাবে। জেগে উঠবেন দশভূজা দেবী দুর্গা। তীর-ধনুক, চক্র-গদা, খড়গ-কৃপাণ, কল্যাণ ও ত্রিশুল হাতে শক্তিরূপী দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা অশুভ এবং অকল্যাণের মহিষাসুর বধে মূর্ত হয়ে উঠবেন। ষষ্ঠী পূজা শেষে শুরু হবে মহাসপ্তমী তিথি। কাল মহাসপ্তমীর তিথীতে কলাবউ রূপী নব দুর্গার স্নানসহ দেবী উমার সপরিবারে তিথিবিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হবে।

যশোরের আট উপজেলায় এবার ৭শ’৪৬টি মন্দির ও মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসবকে শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন ও আনন্দমুখর করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, যশোর জেলা শাখা। নিরাপত্তা জোরদার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এদিকে, সীমান্তবর্তী এলাকা ও যশোর শহরের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল, রেকি ও মোবাইল পেট্রোল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ বৃহস্পতিবার তাদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানায় জেলার আট উপজেলার মধ্যে যশোর সদরে একশ’৭০টি, অভয়নগরে একশ’৩৩টি, মনিরামপুরে একশ’৩১টি, কেশবপুরে একশ’০২টি, বাঘারপাড়ায় ৯২টি, ঝিকরগাছায় ৬১টি, চৌগাছায় ৫৩টি এবং শার্শায় ৩২টি মন্দির ও মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এবার মহা সপ্তমী দুই দিন থাকায় ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।

লিখিত বক্তব্যে জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন ঘোষ জানান, উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যশোর শহরের লালদিঘীর পুকুরপাড়ে পূজা উদযাপন পরিষদের জেলা কার্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। সেখান থেকে সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এনএসআই, ডিজিএফআই, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করা হচ্ছে।

পূজা মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎসব চলাকালে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়েও সতর্ক রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কোনো তথ্যের জন্য কন্ট্রোল রুমের ০১৭১১৩২৫০৮০ নম্বরে যোগাযোগ করতে।

সংবাদ সম্শেলনে জানানো হয় নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতিটি মণ্ডপে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, বিকল্প আলোর ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন এবং স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম প্রবীণদের সমন্বয়ে নিরাপত্তা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। উৎসবের পরিবেশ শান্ত রাখতে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারেএমন গান পরিবেশন থেকেও বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দিপংকর দাস রতন বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হবে। তার মতে, দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য জোরদারেরও একটি উপলক্ষ। এ উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে যশোরে সম্প্রীতির পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে বলে প্রত্যাশা তাদের।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সম্পাদক রতন আচার্য্য, প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত সরকার, সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি রবিন পাল, সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত সরকার, কোষাধ্যক্ষ আনন্দ সাহা এবং পৌর কমিটির সাধারণ সম্পাদক উৎপল ঘোষসহ অন্যরা। এদিকে, শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে যশোরের সীমান্তবর্তী এলাকা ও শহরের পূজামণ্ডপগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ৪৯ বিজিবি। বৃহস্পতিবার যশোর ব্যাটালিয়ন থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে ২৯টি এবং যশোর শহরে ২০টি পূজামণ্ডপে এবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব মণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সদস্যরা ইতোমধ্যে দিন-রাত টহল, রেকি ও মোবাইল পেট্রোল কার্যক্রম শুরু করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় সম্ভাব্য চোরাচালান, নাশকতা ও দুষ্কৃতকারীদের যেকোনো তৎপরতা প্রতিরোধে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে পূজামণ্ডপগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত উদযাপন কমিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মণ্ডপগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন বিজিবি সদস্যরা।

বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন, যশোরের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মোট দুইশ’২২টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দুই হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এসব সদস্য ৫২টি অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প থেকে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন থাকবে বিজিবির এপিসি প্লাটুন ও বিশেষায়িত কে-৯ ডগ স্কোয়াড। সীমান্তবর্তী বিওপিগুলোতেও বাড়ানো হয়েছে জনবল।

যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান, (পিএসসি) জানান, সীমান্তবর্তী পূজামণ্ডপ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পূজামণ্ডপ কমিটির নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোনো দুষ্কৃতকারী যাতে উৎসবের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য বিজিবি আগে থেকেই সতর্ক রয়েছে। যেকোনো প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যশোর ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরে একটি মনিটরিং সেলও গঠন করা হয়েছে।

পূজা উদযাপন পরিষদের প্রস্তুতি, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় যশোরের ৭শ’৪৬টি মন্দির ও মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবেবলে প্রত্যাশা আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের।