৩০০ বছরের প্রাচীন অজ্ঞান ঠাকুরের মন্দির
মশাহিদ আহমদ, মৌলভীবাজার: ইতিহাস, লোকবিশ্বাস আর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের বিরিমাবাদ গ্রামে অবস্থিত প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন অজ্ঞান ঠাকুরের মন্দির। কাউয়াদীঘি হাওরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি ও অলৌকিক কাহিনি। দীর্ঘ তিন শতাব্দী ধরে হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত মন্দিরটি আজও ধরে রেখেছে তার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। রোগমুক্তি, মানত ও মানসিক প্রশান্তির আশায় প্রতিনিয়ত এখানে ছুটে আসেন দ‚র-দ‚রান্তের মানুষ।
স্থানীয় জনশ্রæতি ও ঐতিহাসিক বিবরণে অজ্ঞান ঠাকুরের প্রকৃত নাম কেশব বলে উল্লেখ রয়েছে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত¡নিধির ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থেও তাঁর জীবনকাহিনির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৬নং একাটুনা ইউনিয়নের বুড়িকোনা গ্রামে জন্ম নেওয়া কেশব শৈশবে অত্যন্ত সহজ-সরল স্বভাবের ছিলেন। তাঁর আচরণকে অনেকে স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তির বাইরে মনে করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনযাপন ও আধ্যাত্মিক কর্মকাÐ ঘিরে এলাকায় নানা কাহিনির প্রচলন ঘটে।
জনশ্রæতি রয়েছে, একসময় কেশব নিখোঁজ হয়ে গ্রামের পাশের গভীর জঙ্গলে চলে যান। তিন দিন পর বাড়িতে ফিরে আসার পর তাঁর আচরণে আমূল পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি নির্জনে থাকতে পছন্দ করতেন, খুব কম কথা বলতেন এবং ধ্যান-জপে অধিকাংশ সময় কাটাতেন। একপর্যায়ে তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নিয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে নানা গল্প ছড়িয়ে পড়ে। হারিয়ে যাওয়া গবাদিপশুর সন্ধান দেওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনায় তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বাড়তে থাকে।
কেশবের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কুতুব শাহ নামে এক পীরের সাক্ষাতের কাহিনিও। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, কেশবের আধ্যাত্মিক ভাবাবেগ ও আচরণে মুগ্ধ হয়ে ওই পীর তাঁকে ‘অজ্ঞান’ নামে অভিহিত করেন। সেই থেকে তিনি অজ্ঞান ঠাকুর নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব কাহিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে লোকমুখে প্রচলিত হয়ে আসছে।
অজ্ঞান ঠাকুরকে ঘিরে প্রচলিত কিংবদন্তির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত তাঁর ‘বনমালী’ নামের নৌকার গল্প। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ওই নৌকা একসময় পানি ছাড়াই শুকনো মাটির ওপর দিয়ে প্রায় চার মাইল পথ অতিক্রম করেছিল। এ ছাড়া গভীর রাতে কাউয়াদীঘি হাওর থেকে ঢোল ও করতালের শব্দ ভেসে আসার কথাও শোনা যায়। স্থানীয়দের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, অজ্ঞান ঠাকুর ও তাঁর সঙ্গীদের স্মৃতি এখনো হাওরজুড়ে নানা অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে। যদিও এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি, তবু স্থানীয় লোকসংস্কৃতিতে এগুলোর বিশেষ স্থান রয়েছে।
জীবনের শেষদিকে অজ্ঞান ঠাকুর সন্ন্যাস জীবন বেছে নিয়ে মন্দিরে ধ্যান ও সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন বলে জনশ্রæতি রয়েছে। একসময় তিনি মন্দির থেকে অন্তর্ধান করেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন তাঁর কোনো খোঁজ না পেয়ে গ্রামবাসী মন্দিরের দরজা খুলে ভেতরে একটি বড় গর্ত দেখতে পান। অনেকের বিশ্বাস, ওই গর্ত দিয়েই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। এই রহস্যময় কাহিনি আজও মন্দিরটির প্রতি মানুষের কৌতূহল বাড়িয়ে রেখেছে।
মন্দিরটিকে ঘিরে একসময় কয়েক দিনব্যাপী ‘বারুণী’ মেলার আয়োজন করা হতো। সময়ের পরিবর্তনে মেলার জৌলুশ কমে এলেও মন্দিরে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আগমন অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। এ ছাড়া পৌষসংক্রান্তিতে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে বিভিন্ন এলাকার মানুষের সমাগম ঘটে।
শ্রী শ্রী অজ্ঞান ঠাকুর মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাবুল সূত্রধর জানান, মন্দিরে দিন দিন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের আগমন এই মন্দিরের অসা¤প্রদায়িক চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করছে।
কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ের এই প্রাচীন মন্দির এখন শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি ও সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতির গুরুত্বপ‚র্ণ স্মারক। কালের বিবর্তনে নানা পরিবর্তন এলেও অজ্ঞান ঠাকুরকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও কিংবদন্তি আজও মন্দিরটিকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। স্থানীয় ঐতিহ্যের এই গুরুত্বপ‚র্ণ নিদর্শন সংরক্ষণ ও যথাযথ প্রচারের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
