ফেলে আসা দিনগুলো- ৭৪

এবাদত আলী

১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে চট্রগ্রামে আমার ভাগ্নের বাসায় অবস্থানকালে চট্্রগ্রামের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের অংশ হিসেবে সেদিন আমরা চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে গেলাম। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা হয়েছিলো। এই বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান সংগঠক হিসেবে চাকুরি করে আমার সুহৃদ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কামাল আহমেদ। কামাল আহমেদের বাড়ি পাবনার দাপুনিয়া ইউনিয়নের খোকড়া গ্রামে। আশির দশকের প্রথম দিকে সে টেবুনিয়া ওয়াছিম পাঠশালার ছাত্র এবং আমার বাড়ির পাশে আব্দুল মান্নানের বাড়ি জায়গীর থেকে লেখাপড়া করতো। সেসময় সঙ্গীতানুরাগী হিসেবে আমার বাসায় হারমোনিয়ম এবং ডুগি-তবলা ছিলো। আমার সুহৃদ আব্দুল কুদ্দুস সাগর এবং কামাল আহমেদ মাঝে মধ্যে এসে গলা সাধতো, গান করতো। সপ্তাহে একদিন শহর থেকে আসতো আমার বন্ধুতুল্ল সঙ্গীত শিল্পী তিলংকুমার চৌধুরী এবং তবলা বাদক সমরদা । কাচারি ঘরে বসতো গানের আসর। কামাল সে আসরে মাঝে মধ্যে যোগ দিতো। আমরা তন্ময় হয়ে তার মধুর কন্ঠের গান শুনতাম।
কামাল এসএসসি পাশ করে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয় এবং সেখান থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। ১৯৯১ সালে বিসিএস তথ্য ক্যাডারে চাকুরি লাভ কওে বাংলাদেশ বেতারে যোগদান করে। পরবর্তীতে বদলি হয়ে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র অনুষ্ঠান সংগঠক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলো। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ হতে টেলিফোনে আগেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। আমরা লালখান বাজারের বাঘঘোনা বাসা থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রের বাইরে অভ্যর্থনা কক্ষে অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের মাঝে তখন এক দারুন রোমাঞ্চকর অনুভূতি বিরাজমান। এই সেই ঐতিহিাসিক বেতারকেন্দ্র যার সাথে জড়িয়ে আছে গোটা বাঙালি জাতিসত্বার ইতিহাস।
১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক দিকনির্দেশনী ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন । শেখ মুজিব লাখো জনতার উদ্দেশ্যে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। …. এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দের ভাষণগুলির মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে বিবেচিত।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে বাঙালি নিধনযজ্ঞের সবুজ সংকেত প্রদান করে রাতের অন্ধকারে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমায়। ইয়াহিয়া খানের
নির্দেশ মোতাবেক ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি আর্মি “ অপারেশন সার্চলাইট” নামে অপারেশন শুরু করে। নীল নকশার মূল নায়ক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর আগে রাতের আঁধারে একটি বিশেষ গ্রুপের (কমান্ড ) এক প্লাটুন সৈন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি আক্রমণ করে । ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন আক্রান্ত হওয়ার আগে আগত সহকর্মি ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন ‘‘ আজ থেকে (২৬ মার্চ ) বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র । একে এখন যে করেই হোক রক্ষা করতে হবে ।’’রাত ১২-২০ মিনিটে তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: প্রকাশকাল ঃ নভেম্বর ১৯৮২ এর ১২ নম্বর অনু”্ছেেদ মুজিবনগর প্রশাসন তৃতীয় খন্ডের বর্ণনা মতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় তিনি পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য বাংলার জনগণওক আহবান জানান। চট্টগ্রামে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচারের জন্য পাঠানো হয়। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে অবলম্বন করে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠে করেন। ২৭ মার্চ অপরাহ্নে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ৮ম ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার আরেকটি ঘোষণা পাঠ করেন।বাংলা পিডিয়া ও অপর তথ্য এবং সুত্র মতে ২৬ মার্চ মেজর জিয়া বিদ্রোহ করেন এবং ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণায় তিনি প্রথমে নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান সেনাপতি হিসেবে উল্লেখ করলেও পরবর্তীতে সংশোধন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এই ঘোষণাটি পরবর্তীতে বিদেশী জাহাজ ও আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমের ( যেমন বিবিসি) মাধ্যমে বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীকালে এই কেন্দ্রটি ‘‘ স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’’ নামে পরিচিতি লাভ করে। অবরুদ্ধ বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করতে এবং যুদ্ধের সঠিক খবর ও দিক নির্দেশনা পৌঁছে দিতে এই বেতার কেন্দ্রটি অসামান্য অবদান রাখে।
যাক আমাদের পরিচয় জানানো হলে ইন্টারকম টেলিফোনে আলাপ করে কামাল আমাদেরকে তার অফিস কক্ষে নিয়ে যাবার জন্য একজন কর্মচারিকে পাঠায়। দোতালায় কামাল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। অনেকদিন পর দেখা । কুশল বিনিময় হলো। এবার ঐতিহাসিক এই বেতার কেন্দ্রটির বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে ফিরে দেখা। বিশেষ করে আমরা ১১১ নম্বর কক্ষটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। এই কক্ষটির নাম ‘‘ স্বাধীনতা ঘোষণা কক্ষ।’’ দীর্ঘক্ষণ ধরে আমরা এই কেন্দ্রের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখলাম এবং বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কলাকুশলীদের সাথে ভাব বিনিময় হলো। এবার আমাদের ফিরবার পালা। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট )।

এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব
ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব। তারিখ: ২৯ / ০৭ /২০২৬.