এবাদত আলী
হজ্ব আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থ সংকল্প করা, মনস্থ করা। কোথাও যাবার ইচ্ছা রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট তারিখে মক্কার কা’বাঘর প্রদক্ষিণ, আরাফাত ময়দানে অবস্থান, সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ (দৌড়ানো), মিনায় অবস্থান ও শয়তানকে ঢিল ছোঁড়া প্রভৃতি কতিপয় কাজ যেভাবে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেভাবে সম্পাদন করার নাম হজ্ব।
হজ্ব ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে পঞ্চম। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) সর্বপ্রথম হজ্ব অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করেন। এরপর থেকেই নবী রসুল পরম্পরায় চলে আসছে হজ্ব। বিশ্ব নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) সামর্থবান মুসলমানদের জন্য হজ্ব অবশ্য করনীয় কর্তব্য বলে পুণরায় ঘোষণা করে হজ্বের মর্যাদা আরো সমুন্নত করেন। হজ্ব ফরজ হওয়ার সাল সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইবনে কাছির (র.) বলেছেন, হিজরি তৃতীয় সালে পবিত্র কোরআনে আয়াত (কোঃ ৩ঃ৯৭) অবতীর্ণ করে হজ্ব ফরজ করা হয়। কিন্তু মক্কায় তখন কাফেরদের আধিপত্য থাকায় হজ্ব পালন করা সম্ভব হয়নি। (মারেফুল কোরআন-২ঃ১৯৬ এর তফসির দ্রষ্টব্য)। আবার অনেকে বলেছেন,অষ্টম হিজরির হজ্ব মৌসুমের আগেই মক্কা বিজিত হয়েছিল, এবং তখন হজ্ব ফরজ করা হয়। মক্কার মুসলমান প্রশাসক আত্তাব ইবনে আমীদ (রা.) সে বছর মুসলমান হাজীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। (ফোরকান ৩ঃ৯৪ দ্রষ্টব্য)। কিন্তু সেবারে হজ্ব ইসলামি রীতিতে আনুষ্ঠানিক হজ্ব ছিলনা। নবম হিজরীতে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর নেতৃত্বে যে হজ্ব পরিচালিত হয়েছিল তা ছিল মুসলমানদের আনুষ্ঠানিক হজ্ব।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন হজ্ব অনুষ্ঠানের পুনঃপ্রবর্তন করেন তখন মহান আল্লাহর নির্দেশে পুত্র ইসমাইল (আ.) কে সঙ্গে নিয়ে নির্মাণ করেন খানায়ে কা’বা বা কা’বা ঘর। পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর খানায়ে কা’বা হযরত আদম (আ.) যেস্থানে নির্মাণ করেছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.) সেই ভিতের উপরই নির্মাণ করেন কা’বা গৃহ। নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো কা’বা ঘর সাতবার তাওয়াফ করার। হযরত জিবরাইল (আ.) তথায় উপস্থিত হয়ে হজ্বের সকল আহকাম সম্পর্কে অবহিত করিয়ে দিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে।
মহান আল্লাহর নির্দেশ মেতাবেক পুত্র ইসমাইল (আ.) কে সঙ্গে নিয়ে তিনি কা’বা গৃহ তাওয়াফ করলেন। চুম্বন করলেন হাজরে আসওয়াদ। এক এক করে হজ্বের সকল আহকাম সম্পন্ন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর এ দাওয়াত বিশ্ববাসীর কাছেও পৌঁছে দিলেন তিনি। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ঘোষণা করলেন, হে মানব সমাজ তোমাদের জন্য বায়তুল্লাহের হজ্ব ফরজ হয়েছে। তখন থেকেই কা’বা গৃহ পুণরায় হজ্বব্রত পালনের কেন্দ্রস্থল হিসাবে পরিণত হলো। এর পুর্বে কোন নবী হজ্ব বা অনুরূপ কোন ইবাদতের প্রচলন করার নির্দেশ পেয়েছিলেন কিনা পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোন ইঙ্গিত নেই বলে জানা যায়। হযরত মুসা (আ.) এর অনুসারি ইসরাইলদের জেরুজালেমে তীর্থযাত্রার বিধান সম্পর্কে বর্ণিত আছে। সদা প্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি ইসরাইল সন্তানদের একথা বলে দাও আমি আকাশ থেকে তোমাদের সাথে কথা বল্লাম। তোমরা আমার প্রতিযোগী কিছু নির্মাণ করোনা….। আমার নিমিত্তে মাটির এক বেদি নির্মাণ করবে এবং তার উপর তোমরা হোম বলি, মঙ্গলার্থক বলি, তোমাদের মেষ, তোমাদের গরু উৎসর্গ করবে। (যাত্রা পুস্তক ২০ঃ২২-২৪)। আর বছরের মধ্যে তিনবার আমার উদ্দেশ্যে উৎসব করো। (যাত্রা পুস্তক ২৩ঃ১৪)। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর আহ্বানে লোকেরা মক্কায় হজ্ব করতে আসতে শুরু করেন। কালক্রমে এই তাওহিদের কেন্দ্র কা’বায় ৩৬০টি দেবমুর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে মুর্তি পূজা শুরু হয়। এই হজ্ব অনুষ্ঠানে শিরক ছাড়াও অনেক অন্যায় ও অশালীন অনুষ্ঠান প্রবেশ করে। যেমন নারী-পুরুষের উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করা। এসব কারণে নবম হিজরিতে হযরত মোহাম্মদ (সা.) নিজে হজ্ব পালন করতে যাননি। (শিবলী নোমানী-সিরাতুন্নবী ২য় খন্ড-১২৪)। মদিনাবাসীরা মানাত দেবীর পুজা করতো এবং হজ্বে গেলে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে যেতনা। এসব কারণে পবিত্র কোরআনের আদেশ হলো, (ক) ভবিষ্যতে মুশরিকগণ কা’বায় হজ্ব করতে পারবেনা। (খ) উলঙ্গ অবস্থায় কোন ব্যক্তি কা’বায় তাওয়াফ করতে পারবেনা। (গ) অতঃপর যখন তোমরা হজ্বের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেমনভাবে তোমরা তোমাদের পিতৃ পুরুষকে স্মরন করে থাকো- অথবা এর চেয়েও বেশি। (ঘ) সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন সমুহের অন্যতম, হজ্ব বা উমরাহ সম্পন্ন করে এ দুটিও তাওয়াফ করা উচিত। (২ঃ১৫৮ বুখারি-বাবুল হজ্ব) (ইসলামি বিশ্বকোষ)।
হযরত মোহাম্মদ (সা.) প্রথমে প্রায় এক হাজার পাঁচশ সাহাবী নিয়ে মক্কায় উমরাহ করতে গেলে কুরাইশদের দ্বারা বাধপ্রাপ্ত হন এবং হোদাইবিয়ার সন্ধির পর তিনি দলবলসহ মদিনায় ফিরে যান। এজন্য একে উমরাল হোদাইবিয়া বলা হয়। এরপর মক্কা বিজয়ের দশম হিজরীতে হযরত মোহাম্মদ (সা.) স্বয়ং হজ্বের নেতৃত্ব দেন এবং বিদায় হজ্বে তাঁর বিখ্যাত ভাষণ দেন। শরিয়তের বিধান মতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তার জীবনে অন্ততঃ একবার হজ্ব করা অবশ্য কর্তব্য, যদি সে ব্যয়ভার বহনে সক্ষম হয়। (৩ঃ৯৭)।
কোরবানী বা কোরবান শব্দের অর্থ নৈকট্য লাভ। এই শব্দটি আরবি কুরব অর্থ নৈকট্য। মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর সময় থেকেই কোরবানীর প্রচলন শুরু হয়। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যখন তারা (হাবিল-কাবিল) উভয়েই কোরবানী করেছিল তখন একজনের কোরবানী কবুল হলো এবং অন্য জনের কবুল হলোনা। তাদের একজন বল্লো , (কাবিল) আমি তোমাকে হত্যা করবোই। অপরজন হাবিল বল্লো, আল্লাহ মোত্তাকীদের কোরবানি কবুল করেন। (সুরা মাইদা, আয়াত ২৭)।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় হিসেবে কোরবানী দিবার ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত এবং সর্ব যুগের মানুষের জন্য অনুকরণীয় অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ৮৬ বছর বয়সে একটি পুত্র সন্তান প্রাপ্ত হলেন। বেশ কয়েক বছর পর একদিন রাতে স্বপ্নে প্রিয় বস্তুকে কোরবানী দিবার জন্য তিনি আদিষ্ট হলেন। তিনি কিছু পশু কোরবানী দিলেন। এরপর তিনরাত তিনি একই স্বপ্ন দেখেন এবং পরের দিন পশু কোরবানী দেন। কিন্তু আবারো তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানী দিবার জন্য আদিষ্ট হলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) তখন চিন্তিত হলেন যে, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ইসমাইলকেই মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানী দিতে হবে। হযরত ইসমাইল (আ.) কে একথা বলায় তিনি সানন্দে পিতার ইচ্ছা পুরণে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করলেন। এমনকি পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং আল্লহর নৈকট্য লাভের জন্য তিনি কোরবানী হিসাবে পিতার ধারালো ছুরির তলায় নিজের ঘাড় এগিয়ে দেন। তাঁর বদলে একটি দুম্বা কোরবানী হয়।
এভাবেই তিনি কোরবাীনর অনন্য নজির স্থাপন করলেন। যা ইতিহাসে আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের অনন্য নজির হয়ে রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, “আমি প্রত্যেক বান্দার জন্য কোরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। যাতে আমি তাদেরকে রিজক স্বরূপ যেসব চত্ষ্পুদ জন্তু দিয়েছি সেসবের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। সুতরাং তারই নিকট আত্মসমর্úণ করো এবং সুসংবাদ দাও বিনয়ীগণকে।” (সুরা হজ্ব আয়াত ৩৪)।
কোরবানীর মুল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা এবং বিনীত হওয়া। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আল্লাহর নিকট পৌঁছায়না ওগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশ্ত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (সুরা হজ্ব আয়াত ৩৭)। কোরবানী হচ্ছে মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পশু প্রবৃত্তিটাকে নিধন করার এক প্রতিকী ব্যবস্থা। তাৎপর্য সেখানেই নিহিত। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

এবাদত আলী
সাংবাদিক কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব
ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ: ২৩/০৫/২০২৬.
