এবাদত আলী
(পুর্বপ্রকাশের পর
চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদ এলাকায় শেখ মুজিব রোডের পাশে “ হোটেল সারাহ”তে উঠেই মুখ হাত ধুয়ে নেয়া হলো। কেউ কেউ আবার বাথ রুমের শাওয়ারে গোসলও সেরে নিলেন। টেবিলে সাঁজানো গরম খাবার। তন্দুর রুটি আর খাসির রেজালা। সেই সাথে গরম চা। পেট পুরে খাওয়া হলো। কিছু সময় বিশ্রাম নিবার পর আবার বেরিয়ে পড়া। গন্তব্যস্থান কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত।
চট্টগাম থেকে কক্সবাজারের দুরত্ব ১শ৫৫ কিলোমিটার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার অজানা আশংকা এবং আনন্দ দুটোই তখন মনে শিহরণ জাগিয়ে তুলছিলো। আশংকা ছিলো এজন্য যে, আমাদের রওনাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গপোসাগরে একটি নিম্ন চাপের সৃষ্টি হয়েছিলো। আমার পকেট রেডিওতে বার বার ঘোষণা শুনছিলাম। “ দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গপোসাগরে অবস্থানরতনিম্ন চাপটি আরো ঘনিভুত হয়ে গভীর নিম্ন চাপে রূপ নিয়েছে, গভীর নিম্ন চাপটি চট্টগ্রামের এক হাজার পাঁচ’শ কুড়ি কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিলো।এটি আজ উত্তর অথবা উত্তর-পুর্ব দিকে অগ্রসর হতে পারে। অর্থাৎ আমরা যেন নিম্ন চাপটির দিকেই এগিয়ে চলেছি। তবে সেদিকে আমদের মোটেই খেয়াল নেই। অজানা-অচেনা পথ পাড়ি দিতে যে আনন্দ সে আনন্দের কাছে নিম্ন চাপ তখন পরাজিত। কথায় বলে শখের তোলা আশি টাকা, আমাদেরও যেন তাই। চট্টগ্রাম শহর পেরিয়ে কিছু দুর যাবার পর কর্ণফুলি নদীর বিরাটকায় বেইলি ব্রিজ। দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্রিজ পাড়ি দেয়া হলো। সেই সাথে কর্ণফুলি নদীতে কিছু সাম্পান চোখে পড়লো। ওরে সাম্পান ওয়ালা তুই আমারে করলি দেওয়ানা এমনি গান গেয়ে একসময় এই এলাকার নদী পথে চলতো হাজারো সাম্পান। কালের বিবর্তনে সাম্পান আজ বিলুপ্তপ্রায়। আজকাল ইঞ্জিন চালিত বোট বা নৌকা সে স্থান দখল করে নিয়েছে। এখনো যারা সাম্পান চালায় তাদের কন্ঠে গান ভেসে আসে ‘অ্যাঁরা চাটগাঁইয়্যার নওজোয়ান দুইজ্জার কুলত বসত গাড়ি সিনাদ্যা ঠেকাই ঝড় তুফান।’
বেশ কিছুদুর যাবার পর আনোয়ারা থানা। এরপর পটিয়া থানা ও পটিয়া পৌরসভা। পৌরসভা ছাড়িয়ে বিস্তীর্ন মাঠ। মাঠের মাঝ দিয়েই এঁকেবেঁকে চলে গেছে পাকা সড়ক। মাঠে কৃষকগণ নিবিষ্ট মনে কাজ করে চলেছে। গরু দ্বারা হাল বইছে ইরি ধান লাগানোর জন্য। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত এ অঞ্চলে এখনো কলের লাঙ্গলের প্রচলন শুরু হয়নি। কিছু দুর যাবার পর পাহাড়। পাহাড়িয়া উঁচু নিচু পথে চলতে গিয়ে সে এক অনাবিল আনন্দ। আাঁক-বাঁকা পথে কখনো পাহাড়ের উপর আবার কখনো সমতল ভূমি। দু পাশে উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে লতাগুল্ম যা সবুজ বেষ্টনিতে আচ্ছাদিত।
পাহাড়ের উপরে উঠার সময় আমরা বালুহাটে পৌঁছলাম। এখান থেকে একটি রাস্তা সাতকানিয়ার দিকে চলে গেছে। এই এলাকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি গোল পাতার ছাউনি দিয়ে নির্মিত।
কিছুদুর যাবার পর আবার সমতল ভূমি এবং ফসলের মাঠ। এই এলাকার প্রধান ফসল ধান হলেও কৃষকেরা প্রচুর পরিমানে সিমের আবাদ করে। পাশা-পাশি বেগুন ও মরিচ। কিছু কিছু জমিতে আলুর আবাদ করতে দেখা গেল। দুপুর বারোটা নাগাদ আমরা আদুনগর গিয়ে পৌছলাম। সামান্ন সময়ের জন্য আদুনগরে যাত্রা বিরতি। স্থানটি ঘুরে ফিরে দেখা হলো। এই আদু নগরে ইসলামি সেন্টারের পক্ষ থেকে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বিশাল মাদ্রসা ও মসজিদ। বহু অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই মসজিদটি দেখার মত বটে। চা-নাস্তা পর্ব সমাধা করার পর নিজ নিজ আসনে গিয়ে বসতেই কোচটি আবার চলতে শুরু করলো। হারবার এবং বড়ইতলি পার হবার পর শুরু হলো গহীন অরণ্যের মাঝ দিয়ে চলা। দু-ধারে উঁচু পাহাড়। মাঝখানে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ের উপর যৎসামান্য সমতল ভূমি এবং পাহাড় গাত্রে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে বাঁশ দ্বারা। এ এলাকায় বাঁশের ছড়াছড়ি। তাই ঘরবাড়ি নির্মাণ কাজে ছাদ ঢালাই করতে যে শার্টার ব্যবহার করা হয় তাও বাঁশের পাটাতন দ্বারা।
আমরা একসময় চকোরিয়ার ডুলা হাজরা পোঁছলাম। এই ডুলাহাজরাতে রয়েছে দেশের একমাত্র হরিণ প্রজনন কেন্দ্র। এখানে আমাদের যাত্রা বিরতি ঘটলো। হরিণ প্রজনন কেন্দ্রটি ঘুরে ফিরে দেখতে হবে।কক্সবাজার বন বিভাগের অধীনে ন্যস্ত এই প্রজনন খামারের আয়তন ১শ’৫ একর। প্রজনন কেন্দ্রে হরিণ রয়েছে ৫০/৫৫টি। প্রাণীদের পানীয় জলের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে ৫ একর আয়তনের একটি লেক রয়েছে। হরিণ প্রজনন কেন্দ্রে কয়েকটি সাম্বার ও কয়েকটি গয়াল রয়েছে। অজগর সাপও রয়েছে এখানে। আগে প্রজনন কেন্দ্রটির চারপাশে কাঁটা তারের বেড়া ছিলো। বুনো হাতির আত্রমণে বেশ কিছু এলাকার বেড়া ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কেন্দ্রটি সম্প্রসারণ পুর্বক পর্যটকদের জন্য একটি সাফারি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেল। এই এলাকাটি ঘন শালবনে আবৃত যেন। মাঝে মাঝে কিছু সমতল ভূমিতে সামান্য ফসল জন্মে।
বেশ কিছু দুর যাবার পর রামুর রাস্তা। আমরা চট্টগ্রাম থেকে যে রাস্তা ধরে কক্সবাজারের দিকে চলেছি এই রাস্তায় দুর পাল্লার বাস চলাচল খুবই কম। চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, সিনেমা প্যালেস চত্বর এবং জিপিওর বিপরীত কাউন্টার থেকে এস আলম, সৌদিয়া ও বোরাক পরিবহন কক্সবাজার যায় এবং কক্সবাজার থেকেই সুর্যাস্তের পূর্বেই তা চট্টগ্রামের ফিরতি পথ ধরে। এই এলাকায় সাঁঝ নামার সাথে সাথেই ডাকাতেরা ওঁৎ পেতে থাকে। আমাদের বিলাস বহুল কোচটি তাই টানা হর্ন বাজাতে বাজাতে দুপুরের দিকেই কক্সবাজার শহরে এসে পৌঁছলো। হাজারো পর্যটকের অপনোদনের বিনোদন কেন্দ্র কক্সবাজার শহরটি বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ পুর্বে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত প্রায় তিন বর্গ মাইলের এই শহরটি একটি জেলা শহর। (ক্রমশঃ)
(লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী,
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি.
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব, ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ; ৩১/০৩/২০২৬
