এবাদত আলী
আখেরী নবী হযরত মোহ্ম্মাদ (সা.) এর ওফাতের পর দীন-ইসলামের ঝান্ডা উড্ডীন রাখার জন্য ওয়ারেছাতুল আম্বিয়া বা নবীগণের ওয়ারেছ হিসেবে এই দুনিয়াতে যুগে যুগে যেসকল ওলি আল্লাহর আবির্ভাব ঘটেেেছ তন্মধ্যে হযরত শায়খ মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) ১৫৬৪ খিস্টাব্দে ২৬ জুন মোতাবেক ৯৭২ হিজরীর ১৪ সাওয়াল ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের সেরহিন্দ শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শায়খ মাখদুম আব্দুল আহাদ একজন বিখ্যাত আলেম এবং বুজর্গ ছিলেন। হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি এমন একজন আওলিয়া যাঁর শানে হযরত রাসুলে পাক (সা.) ভবিষৎ বাণী করেছিলেন। “ রওজায়ে কাইয়ুমাত ” কিতাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত হুজুর পাক এরশাদ করেছেন, “ ১১ শতাব্দির প্রথমভাগে দুই ধর্মদ্রোহি স্বেচ্ছাচারি বাদশাহের রাজত্বের মধ্যবর্তী সময়ে একজন মহাপুরুষ দুনিয়াতে আগমণ করবেন। আমার নামের অনুরূপ হবে তার নাম। যিনি এক উজ্জল সদৃশ্য হবেন এবং সহস্র সহস্র ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে জান্নাতে দাখিল হবেন।” হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) এর নাম ছিল আহম্মদ। সেরহিন্দ শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মগ্রহণ সম্পর্কে ভবিষৎ বাণীর আরো কাহিনী জানা যায় বিভিন্ন কিতাব হতে।
আওলিয়াকুল শিরমনি হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (র.) একদা কোন এক গভীর অরণ্যে ধ্যান যোগে দর্শন করেন যে, আকাশ হতে এক জ্যোতির আবির্ভাব হয়ে সমস্ত জগত আলোকিত হলো। তিনি আরো অবগত হলেন যে, তাঁর জামানার ৫শ বছর পরে পৃথিবী র্শিক ও বেদা’য়াতে ভরে যাবে এবং ইসলাম মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছবে। তখন এক অসাধারণ মহাপুরুষ আগমণ করে ধরাধাম হতে র্শিক বেদা’য়াত দুর করে মৃতপ্রায় ইসলামকে পুনর্জ্জীবিত করবেন। তাঁর সংসর্গ ষ্পর্শমণিতুল্য হবে। তাঁর আওলাদ ও শিষ্যগণ আল্লাহর দরবারে বিশেষ সন্মান ও অনুগ্রহ লাভ করবেন। গওসুল আযম হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (র.) তাই আপন পবিত্র খেরকা স্বীয় পুত্র তাজ উদ্দিন আব্দুর রহমানকে অর্পণ করে নির্দেশ করেন যে, তুমি সেই আওলিয়া প্রবরকে আমার সালাম জানিয়ে তাঁকে প্রদানের ব্যবস্থা করবে। সাহেবজাদা তদ্বীয় পুত্রকে ঐ খেরকা প্রদান করে উক্ত আদেশ করে যান। অবশেষে বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (র.) এর প্রপৌত্র হযরত সৈয়দ সেকেন্দার কাদরী (র.) ১০১৩ হিজরি সালে ঐ পবিত্র খেরকা হযরত মোজাদ্দেদ (র.) এর খেদমতে পেশ করেন। মাকামাতে সায়খুল ইসলাম শেখ আহম্মেদ জাম (র.) এ বর্ণিত আছে, হযরত আহম্মেদ জাম এরশাদ করেন যে, আমার জামানার পর ১৭ জন আমার নামে পৃথিবীতে আগমণ করবেন। তন্মধ্যে শেষজন ৪শ বছর পর আগমণ করবেন। তিনিই অদ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ আওলিয়া হযরত শেখ আহম্মদ সেরহিন্দি (র.)। মাকামাতে শেখ খলিল উল্লাহ বাদাশখানি কিতাবে উল্লেখ আছে, হিন্দুস্থানে নকশবন্দিয়া তরিকাভুক্ত এক মহান আওলিয়ার আবির্ভাব হবে, দুঃখের বিষয় তাঁর সাথে আমার সাক্ষাত হবেনা। অতঃপর তিনি সেই মহান আওলিয়া প্রবরের উদ্দেশ্যে স্বহস্তে একখানা পত্র লিখে তদ্বীয় শিষ্য আব্দুর রহমান বাদাশখানি (র.) এর হস্তে অর্পণ করে নির্দেশ করেন যে, এই পত্র যেন সেই আওলিয়া প্রবরকে অর্পণ করা হয়। হিজরি ১০১২ সালে ঐ লিপি হযরত মোজাদ্দে (র.) এর খেদমতে পেশ করা হয়।
হযরত আহম্মেদ সেরহিন্দ মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেন সেই সেরহিন্দ নামক স্থান ছিল বন-জঙ্গলে পরিপুর্ণ। এই স্থানের নাম ছিল সের বন্দ বা বাঘের শহর। একদা ফিরোজ শাহ তুঘলক পাঞ্জাব হতে ফিরবার পথে বিশ্রামের জন্য তাঁবু স্থাপন করেন। তাঁর সৈন্যদের মধ্যে একজন আল্লাহর ওলি ছিলেন। তিনি কাশ্ফ দ্বারা জানতে পারলেন যে, এখানেই দ্বিতীয় সংস্কারক বা মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) জন্মগ্রহণ করবেন। তাই ফিরোজ শাহ তুঘলকের নিকট এখানে শহর গড়ার প্রস্তাব দিলে তিনি তাতে রাজি হন এবং বন-জঙ্গল পরিস্কার করে শহর গড়ে তোলা হয়। হযরত বু-আলী কলন্দর এবং হযরত ইমাম রফিউদ্দিনের হাতে এই সেরহিন্দ শহরের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। হযরত আহম্মেদ সেরহিন্দি মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) তাঁর পিতার নিকট হতে সর্বপ্রথম আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর বুজর্গ পিতা ওছিয়ত করেছিলেন যে, নকশবন্দিয়া তরিকার কোন পীরের সাক্ষাৎ পেলে তিনি যেন তাঁর নিকট নেছবত হাছেল করেন।
পিতার ওফাতের পর হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) হিজরি ১০০৮ সালে হজব্রত পালনের জন্য মক্কা শরীফে রওনা হন। পথিমধ্যে দিল্লীতে মওলানা হাসান কাশ্মিরীর সাথে সাক্ষাত হয়। তাঁর নিকট হতে নকশবন্দিয়া তরিকার পীর হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ (র.) সংবাদ জেনে তাঁর খেদমতে হাজির হলে তিনি তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং বয়াত করে ছোলক মোকাম দিতে তাওয়াজ্জোহ প্রদান করেন। হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) তাঁর পীরের আদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারে ব্রতি হন। এসময় সম্রাট আকবর দীন-ই ইলাহি ধর্ম প্রচার করতে থাকলে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। হজরত মোজাদ্দে আলফেসানি(র.) তার অনুসারিদেও মাধ্যমে স¤্রাট আকবরের নিজস্ব সৃষ্টি দী¦ন-ই- ইলাহির বিরোধিতা করেন এবং মানুষকে সত্যিকারের ইসলামের পথে ফিওে আসার আহবান জানান। ফলে তাদেও মধ্যে একটি আদর্শিত সংঘাত সৃষ্টি হয়।
সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গির সিংহাসনে বসেন। তিনিও তাঁর পিতার পদা্কং অনুসরণ করতে থাকেন। এদিকে রাজ্যের অনেক প্রধান ব্যক্তিসহ স্বয়ং সেনাপতি মহব্বত খাঁ এবং অন্যান্য রাজকর্মচারি হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) এর হাতে বয়াত হন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন। অতি অল্প দিনের মধ্যেই কুটির বাসি, দীন দরিদ্র থেকে শুরুকরে উচ্চ পর্যায়ের লোকজন তাঁর মুরিদ হিসেবে গণ্য হয়ে তরিকা প্রচারে ব্রতি হন। সম্রাট জাহাঙ্গির সিংহাসন হারাবার ভয়ে ভীত হয়ে হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) কে শায়েস্তা করার জন্য পন্থা খুঁজতে লাগলেন। একসময় তাঁকে বাদশাহী দরবারে আমন্ত্রণ জানানো হলো এবং তিনি যেন বাদশাহকে তাজিমী সেজদা করেন একথাও তাঁকে বলা হলো। এব্যাপারে সকলে তাঁকে অনুরোধ করলো এমনকি মুফতি আব্দুর রহমান কিতাব খুলে তাঁকে দেখালো যে, বাদশাহকে তাজিমী সেজদা করা জায়েজ আছে। হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) উন্নত শিরে দরবারে উপস্থিত হলেন। সম্রাট তাঁকে সেজদা না করা এবং সালাম না দেয়ার জন্য কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিলেন যে, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা করা হারাম। আর কোন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সালাম দেয়াও নাজায়েজ।
এতে সম্রাট উত্তেজিত হয়ে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। তিনি ৫৩ বছর বয়সে গোয়ালিয়ার দুর্গে অন্তরীণ হন। এসময় দুর্গবাসি সকল কয়েদি তাঁর নিকট বয়াত গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর এবাদতে মশগুল হয়ে বন্দেগি করতে থাকেন। এদিকে সেনাপতি মহব্বত খাঁসহ শাহি ফৌজের অনেক পদস্থ ও আমিরগণ সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি সকলকে ধৈর্য ধারণ করতে বলেন। কথিত আছে একদিন বাদশাহ দরবারিদের নিয়ে বসে আছেন। হঠাৎ চিৎকার করে বলে ওঠেন হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) আমায় ফেলে দিচ্ছেন। বলতে বলতে তিনি সিংহাসন থেকে সত্যি সত্যিই মাটিতে পড়ে যান এবং গুরতর আহত হন। তিনি ভীত হয়ে মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) কে মুক্তি দেন এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সেই সাথে তাঁর হাতে বয়াত হন।
হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (র.) ২৮ সফর-১৪৪৬ হিজরী মোতাবেক ২০ জুন ১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে,- ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। সেরহিন্দ শহরেই তাঁর মাজার অবস্থিত। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখ: ১৯/০৬/২০২৫.
