চুম্বন বা চুমা নিয়ে কিছু কথা

এবাদত আলী
চুম্বন বা চুমা শব্দের অর্থ হলো দুই ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে কাউকে আদর করা বা স্নেহ প্রকাশ করা। সাধারণভাবে প্রেম , কাম, স্নেহ, অনুরাগ, শ্রদ্ধা. সৌজন্য অথবা শুভেচ্ছা প্রকাশার্থে অন্য কারো চিবুক, অধরোষ্ঠ, করতল, কপাল বা অন্য কোন অঙ্গে ঠোঁট অর্থাৎ অধরোষ্ঠ স্পর্শ করা। স্নেহ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের জন্য চুম্বন একটি সাধারণ প্রথা। যৌন সঙ্গমকালে চুম্বন একটি গুরুত্বপূর্ণ শৃঙ্গার। অতীত ইতিহাস হতে জানা যায়, সংস্কৃত চুম্বন হতে বাংলায় চুমা, চুমু, চুমো বিভিন্ন শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। মানব সভ্যতার বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের অনুষ্ঠান ও উৎসবে চুম্বন প্রথা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি অভিবাদনের সাধারণ একটি রীতি।
চুম্বনের ফলে মানুষের শরীরে নানাধরনের ইতিবাচক রাসায়নিক ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে থাকে যা নাকি মানসিক চাপ কমাতে সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে সাহায্য করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে চুম্বন করার সময় ব্রেন থেকে অক্সিটেসিন হরমোন নিঃসত হয়। এটি দুজনের মধ্যে মানসিক টান বিশ^াস এবং ভালোবাসার অনুভূতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই দুটি হরমোন মানুষের মনে আনন্দ উদ্দীপনা এবং সুখের অনুভূতি তৈরি করে যা মনকে নিমিষেই ভালো করে দিতে পারে। ফলে মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা হ্রাস পায়। চুম্বনের সময় মুখের লালার আদানপ্রদানের ফলে একে অপরের শরীরে নতুন কিছু ব্যকটেরিয়ার প্রবেশ ঘটে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। রোমান্টিক চুম্বনের সময় হ্রদস্পন্দন বৃদ্ধি পায় যা রক্ত নালীগুলোকে প্রসারিত করে। এর ফলে শরীরে রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। রক্তনালী প্রসারিত হওয়া এবং এন্ডোরফিন হরমোন নিঃস্বরণের কারণে চুম্বন মাথা ব্যাথা বা পিরিয়ডের ক্রাম্পের মত শারীরিক ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। আরো জানা যায় একটি গভীর চুম্বনের সময় মুখের প্রায় ৩৪ টি পেশী এবং ১১২ টি পসচুরাল পেশী সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি মুখের পেশী টান টান রাখতে এবং বলিরেখা দুর করতে সাহায্য করে। চুম্বন করার সময় মুখের অতিরিক্ত লালা তৈরি হয়। এই লালা দাঁতের ক্ষতিকর এসিড ধুয়ে ফেলে এবং ক্যাভিটি বা দাঁতের ক্ষয় রোধে ভুমিকা রাখে।
চুমা বা চুম্বনের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যলয়ের একটি নতুন গবেষণা হতে জানা যায় এটির বয়স প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ বছরেরও বেশি। গবেষকদের মতে, মানুষ ও বর্তমান ত্রপদের (যেমন শিম্পাঞ্জি, বোনোবো গরিলা) সাধারণ পুর্বপুরুষদের মধ্যেই চুম্বনের উৎপত্তি হয়েছিলো। আশ্চর্যের বিষয় আজো পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতে রোমন্টিক চুম্বন নেই। নথিভূক্ত মানব সমাজের মাত্র ৪৬ শতাংশ এই চুম্বনকে ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করে। বাকি সমাজে এটি হয়তো অভিবাদন, শ্রদ্ধা, বা অন্য কোন অর্থ বহন করে কিংবা একবারেই অনুপস্থিত। চুমা বা চুম্বন শুধু ভালোবাসা বা রোমান্সের প্রতীক নয়। এটি লাখ লাখ বছর ধরে প্রাইমেটদের (মানুষসহ) সামাজিক বন্ধন মজবুত করার একটি প্রাচীন জৈবিক আচরণ।
ভালেবাসার বঃিপ্রকাশ হলো চুমু। প্রেমের প্রকাশ চুমু। শিশুকে আদরের জানান দেওয়া হয় চুমু দিয়ে। এমনকি খেলার মাঠে গ্যালারি থেকে খেলোয়াড়ের দিকে উড়ন্ত চুমু ছঁড়ে সমর্থন প্রকাশ করা হয়ে থাকে। বিনয় ও শ্রদ্ধা জানাতে হাতে আলতো চুমু দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন পর সন্তান বিদেশ থেকে ফিরলে বাবা মা সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে প্রতীক্ষা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আবার যৌনতার বঃিপ্রকাশ ঘটায় চুমু। দেশ ও সংস্কৃতি ভেদে চুমুর অর্থও কিছুটা বদলে যায়। অন্ধ প্রেমে মজে গিয়ে পেমিক-প্রেমিকা যে চুম্বনে মেতে ওঠে তা থেকে বিরত থাকা তাদের জন্য খুবই কঠিন এবং কষ্টকর। লাইলীর প্রেমের টানে কায়েস বিন মুলাওয়াহ অর্থাৎ মজনু যখন লাইলীর বিরহে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলো তখন রাস্তায় একদিন দেখা পায় লাইলীর কুকুরের সাথে। মজনু সেই কুকুরকে জড়িয়ে কুকুরের গলায় সেদিন চুমু খেয়েছিলো। মজনুর ব্যাখ্যা ছিলো এটা লাইলীর কুকুর। এর গলায় লাইলীর স্পর্শ আছে। আমি লাইলীর সেই স্পর্শকেই চুমু খেলাম। বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, তা হলো ‘‘ বাঘের গলায়ও চুমু, বিড়ালের গলায় ও চুমু।
বাংলা ও বিশ^ সাহিত্যে চুমু বা চুম্বন নিয়ে অনেক বিখ্যাত কবি নানা আবেগ ও অনুভূতিতে কবিতা রচনা করেছেন। বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার চুম্বন কতিায় লিখেছেন,‘‘ দুইটি তরঙ্গ উঠি প্রেমের নিয়মে/ ভাঙিয়া মিলিয়া যায় দুইটি অধরে। দেহের সীমায় আসি দুজনের দেখা / প্রেম লিখিতেছে গান কোমল আখরে / অধরেতে থরে থরে চুম্বনের খেলা।’’ কবি দীপাঞ্জন হালদার লিখেছেন, ‘ পেম কিংবা পেমিকা পরিবার কিংবা বন্ধু / ভালোবাসার প্রধান মাধ্যম হলো চুমু।’’ কবি ম্যাক আজাদ, ‘‘ আমার গাঢ়তম গভীর চুম্বন/ নিংড়ে নিক তোমার নিরাভরন।” কবি হিমেল হাসান বৈরাগী. ‘‘ কবে যে শেষ চুমু খেয়েছিলাম মনে নেই/ হয়তো জন্মের ও বহু বছর আগে/সম্ভবত শায়েস্তাখার আমলে / তখন চাল ও চুমুর দাম ছিলো সস্তা।’’ কবি অসীম সাহা তার কবিতায় চুমু সম্পর্কে লিখেছেন,‘‘ একটি চুম্বন দাও/ শীতার্ত রাত্রিতে আমি তোমার দরজায় সারা রাত দাড়িয়ে থাকবো।’’ অতি সম্প্রতি সৌদি আরবে বাংলাদেশের এক যুবক নজরুল ইসলাম এবং যুবতি সুইটি আকতার প্রেমের ভাবে গদ গদ হয়ে একটি মসজিদে নামাজ ও মোনাজাত শেষে একে অপরকে চুমা খাবার অপরাধে দুজনকেই দীর্ঘ কারাভোগের পর বিচারের রায়ে গর্দান দিতে হয়েছে। তাদের এক জনের বাড়ি কুমিল্লায় এবং অপর জনের বাড়ি বগুড়ায় বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক জানিয়েছেন।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থাবলীতেও চুম্বনের কথা বর্ণিত হয়েছে। হোমারের রচনা থেকে জানা যায় যে, প্রাচীন গ্রিসে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পন্থা হিসেবে ওষ্ঠ, হস্ত ও পদ চুম্বনের প্রথা প্রচলিত ছিলো। প্রাচীন রোমে ইসাক ডি ইসরায়েলির বর্ণনা থেকে জানা যায়, কেউ কেউ এক নায়কের হস্ত চুম্বনের অনুমতি প্রাপ্ত হলে ‘ নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করতেন।’ চুমা বা চুম্বন প্রায়শয়ই ধর্মোপাসনার অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত হয়। হজ্জ¦ পালনকালে মুসলমানেরা খানায়ে কাবায় স্থাপিত হাজরে আসওয়াদ নামক পাথরটিতে চুম্বন করে থাকেন। পীর আওলিয়ার দরবারে মুরিদ এবং ভক্তবৃন্দ তাদের আপন পীর- মুর্শিদের সান্নিধ্যে গিয়ে অতি ভক্তি সহকারে পীর মুর্শিদের কদম চুম্বন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।