ফেলে আসা দিনগুলো- ৬৭

এবাদত আলী

আমরা যখন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মূল প্রান্তে তখন বিকেল গড়িয়ে সাঁঝের আগমণী সুর বাজছে। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালার সাথে সেই সুর কিনারে আছড়ে পড়ছে। ভেজা বালির উপর দিয়ে তা গড়িয়ে গড়িয়ে পর্যটকদের পদযুগল চুম্বন করে ফিরে যাচ্ছে বারংবার।
কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে –
“যেন জোয়ার জলের ফেনা রাশি
বাতাসে আজ ছুটছে হাসি।”
সমুদ্র দর্শন আর সমুদ্র উপভোগের এ হিরন্ময় মূহুর্তটি ভাষায় ব্যক্ত করা সুকঠিন। বিশাল সাগরের হাতছানিতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছিলো। এমনি নৈসর্গিক অনুপম দৃশ্য অনুভবে যা বিরল তা ভাষাহীন। এখানে এসেছে হাজারো যুবক যুবতি। রূপালি সৈকত নীলাভ সমুদ্রের তরঙ্গে তরঙ্গে আছড়ে পড়া শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে প্রেমিক প্রেমিকার কথোপকথন। চুটিয়ে প্রেম করার জর‌্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট স্থান বোধ করি ধরাধামে আর নেই। এখানে কুলাকুলিতে দোষ নেই। ঢলাঢলিতে কারো কোন ওজর আপত্তি নেই। সমুদ্রের উথাল পাথাল ঢেউ প্রায় সকলকেই ছন্দায়িত করে। এখানে ছন্দ পতন কারো কাম্য নয়। এখানে সমুদ্র যেমন বিশাল, মানুষের মনও তেমন। সংকীর্নতার ঠাঁই নেই। যুবকেরা উদাম গায়ে জাঙ্গিয়া, হাফ প্যান্ট, ফুলপ্যান্ট পরে সাগরে নেমে ঢেউয়ের তালে তালে নৃত্য করছে। যুবতিরাও অনুরুপ খেলায় মত্ত। সিক্ত বসনে উঠে আসতে যুবকের জন্য যেমন কোন সংকোচ নেই যুবতিদের বেলায় একই কথা। এখানে মুক্ত মনের অনাবিল আনন্দ। এ আনন্দে বাধ সাধবে কে?
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুর্যাস্ত একটি আকর্ষনীয় ও শিহরণময় ক্ষণ। যারা বা যে কেউ কক্সবাজারে এলে সমুদ্রের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে সুর্যাস্তের দৃশ্য অবলোকন করার লোভ সম্বরণ করা যায়না। সূর্য ক্রমে হেলে পড়ছে; পর্যটকদের আগ্রহ ততই বাড়ছে। বায়নোকুলার, টেলিলেঞ্চ সহযোগে হাতের ক্যামেরা তাক করা। সকলের দৃষ্টি তখন একই নিশানায় বন্দি। ধীরে ধীরে সূর্য অস্তমিত হলে তবেই মোহচ্ছন্নতার অবসান ঘটে। সাঁঝ নামার সঙ্গে সঙ্গে বিস্তীর্ন সমুদ্র সৈকতে সারিবদ্ধ বিদ্যুতের বাতিগুলো ঝলমল করতে থাকে। তখন পায়ে চলা পথ বা ওয়াকওয়ে বরাবর পিঁপড়ের সারের মত পর্যটকদের ফিরবার পালা। সমুদ্র সৈকতে অনেক দোকানি তাদের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। ঝিনুকের মালা হাতে ছোট ছোট ঝিনুক কন্যারা ফেরি করে বেড়ায়। শংখ ও শামুকের দোকান রয়েছে বেশুমার। কড়ির দ্রব্যাদিও এখানে পাওয়া যায়। পর্যটকেরা সমুদ্র সৈকতের স্মুতি হিসেবে কিনছে দেদারছে।
আমরা একসময় সদলবলে সমুদ্র সৈকত হতে “হোটেল সাগর গাঁও” এ ফিরে এলাম। হোটেল বয় শওকতকে বলে হাল্কা নাস্তা ও চায়ের বৗবস্থা করা হে লা। ক্লান্তিভারে শরীর নুইয়ে আসতে চাইলো। কিন্তু কক্সবাজারের উল্লেখযোগ্য স্থান বার্মিজ মার্কেট না দেখে কি থাকা যায়? তাই এক রাশ ক্লাšি নিয়েই আবার বেরিয়ে পড়তে হলো। স্বজাতিক পোষাক পরিহিত চন্দন চর্চিত মুখে কক্সবাজারের বার্মিজ দোকানিরা বসে আছে। বার্মিজ মার্কেটগুলোতে বার্মিজ সেলস গার্লদের সদা হাসি মাখা মায়াবী মুখখানা যে কোন খরিদ্দারকে আকৃষ্ট করে। দোকানে থরে থরে সাজানো কম্বল, চাঁদর, টাওয়েল, গ্রামীণ চেকে থ্রিপিস, টু টিস, হাফ শার্ট, পাঞ্জাবি, ফতোয়া, বেডসিট, লুঙ্গি, শার্ট পিস, ওড়না ও সুদৃশ্য পিলো কভার ইত্যাদি। তবে বার্মিজ দোকানগুলোতে ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে হলো। কিছু কেনা-কাটা করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। কেচকি মাছ আর গরুর ভুনা গোশত দ্বারা রাতের খাবার খেয়ে লম্বা ঘুম।
পরদিন ঘুম ভাঙলে প্রাতঃপর্ব সমাধান্তে ফজরের নামাজ আদায় করে হোটেল থেকে বেরিয়ে আমরা কোচের সিটে গিয়ে বসলাম। আমাদের গন্তব্যস্থান টেকনাফ। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পুর্বে অবস্থিত সীমান্ত এলাকা টেকনাফ। মায়ানমার সীমান্তে নাফ নদীর তীরে টেকনাফ অবস্থিত। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের দুরত্ব ৭৯ কিলোমিটার। বলতে গেলে স্লোগান নির্ভর রাজনীতির খুব পরিচিত স্লোগান টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া…, সবাই বলে…..। কোন কোন নেতা নেত্রি আবার এইস্লোগানে গর্জে ওঠেন। যেমন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত…… ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশের মানচিত্রের মাথায় উত্তরে পাখির ঠোঁটের মত জায়গাটির নাম তেঁতুলিয়া; জেলা পঞ্চগড়। আর সর্ব দক্ষিণে কক্সবাজার জেলার একটি থানার নাম টেকনাফ। যাক আমাদের কোচ এগিয়ে চলেছে। নির্জন এলাকা অতিক্রম করছে দ্রুত গতিতে। পথের দু’ধারে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। মাঝে মধ্যে বসতি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সম্ভবত মরিচা পর্যন্ত এই রাস্তা পাকা করা হয়। ১৯৭২ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখে তৎকালিন যোগাযোগ মন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এই রাস্তার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী ফলকটি আজো তার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। এখান থেকে রামু থানার দুরত্ব ১৪ কিলোমিটার। কিছু দুর যাবার পর উখিয়া উপজেলা পরিষদ। এখানে আছে উজেলা ভূমি অফিস, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, খাদ্য গুদাম ও উখিয়া ডিগ্রি কলেজ। গহীন অরন্যরাজিতে ঘেরা অঞ্চলে এহেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখে বেশ ভালো লাগলো।
এরপর শুরু হলো ঘন পাহাড়িয়া এলাকা। এলাকার বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে সেগুন, জারুল, গর্জন, গামাইর, চাপালিশ, বৈলাম, চম্পা, বাঁশ ও বেত। রাবার গাছও আছে প্রচুর। আমাদের কোচ মাঝে মাঝে পাহাড় বেয়ে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ ফুট ওপরে উঠছে। আবার কিছু দুর চলার পরে অভিমানে যেন মুখ নিচু করছে। গড় গড় করে যেন নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। কতযে শিহরণ আর বিচিত্র অনুভূতি মগজে তখন কিলবিল করছে তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। গহীন পাহাড় আর অরন্যের মাঝে পাখির কলকাকলী আর গাছের শুকনো পাতার মরমর ধনি শব কিছুকে ছাপিয়ে বিকট শব্দে হর্ন বাজাতে বাজাতে ছুটে চলেছে আমাদের বিলাস বহুল কোচ। এরপর বুলাখালি বিডি আর ক্যাম্প।
(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।