ফেলে আসা দিনগুলো- ৬৫

এবাদত আলী
(পুর্বপ্রকাশের পর )
কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম মনোরম স্বাস্থ্যকর স্থান। পৃথিবীর অন্যতম স্স্থ্যকর স্থান বললেও
বোধ হয় বাড়িয়ে বলা হবেনা। কক্সবাজারকে অনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী। কক্সবাজারের দীর্ঘায়ত রূপালি সৈকত-যার দৈর্ঘ ১শ ২০ কিলোমিটার। নীল সমুদ্রের তরঙ্গ আছড়ে পড়া শব্দে চকিত হয় মন। শহরের সামনে বিশাল সমুদ্র। পিছনে সৈকতের পথে বিস্তৃত হয়ে আছে প্রায় ৯৬ কিলোমিটার পাহাড়ের সমান্তরাল সারি। পাহাড়ের গায়ে অরণ্যরাজি লেপ্টে আছে সবুজের সমারোহে। এ যেন বিশাল ক্যানভাসে আঁকা শিল্পীর নিপুণ হাতের মনোরম ছবি। বির্স্তীর্ন সৈকতে ছড়ানো বালুকা রাশি প্রাকৃতিক পরিবেশকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। সাগর আর পহাড় যেন এখানে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সমুদ্র পিপাসু পর্যটকদের ভিঁড়ের সুবাদে এখানে হোটেল ব্যবসা জমজমাট। এই ছোট্ট শহরটিতে প্রায় দেড়শ হোটেল রয়েছে। কয়েকটি মোটেলও আছে এখানে। কক্সবাজারের প্রধান সড়কে আমাদের কোচ গিয়ে থামতেই মধ্য বয়সী এক রিক্সা চালক এগিয়ে এসে জানালো যে, তার বাড়ি দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জে। তার নাম লুৎফর রহমান। সে আমাদেরকে একটি ভালো হোটেলে নিয়ে যেতে চায়। অঞ্চল বলে কথা । তার বাড়ি উত্তাঞ্চলে হওয়ায় আমরা তার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। সে আমাদেরকে প্রধান সড়েেকর ঝাউতলা অভিজাত আবাসিক হোটেল “ হোটেল সাগর গাঁও” এ নিয়ে গেল। এক সঙ্গে এতগুলো লোক পেয়ে হোটেল ম্যানেজার বেশ তৃপ্ত বলে মনে হলো। তিনি আমাদের যতœআত্মির কোনরুপ ত্রুটি করলেননা।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিবার পর বাথরুমের শাওয়ারের ঠান্ডা পানিতে গোসল এ অনুভুতি প্রকাশের কোন ভাষা তখন আমার জানা নেই। যেন নতুন জীবন লাভ। এরপর নিচতলার রেস্টুরেন্টে গিয়ে কেঁচকি মাছসহ (অতি সুস্বাদু ছোট মাছ) গরুর ভূনা গোশত দিয়ে চিকন চাউলের ভাত। এ খাবারেরও কোন বর্ণনা হয়না। খাবার শেষে কিছু সময়ের জন্য হলেও বিশ্রাম। আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে। কারণ নিম্ন চাপ অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। অতঃপর সমুদ্র সৈকতে যাত্রা।
মাথায় সান ক্যাম্প, চোখে সূর্যের আলো প্রতিরোধক চশমা, হাতে বায়নোকুলার ও ইয়াসিকা ক্যামেরা, পকেটে মিনি টেপরেকর্ডার নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল চত্বরেই রিকসা প্রস্তুত। টুং টাং বেল বাজিয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো রিকসা এগিয়ে চললো ভিঁড় ঠেলে। এসময়টায় ভিঁড় একটু বেশি। দেশ-বিদেশের প্রায় ৫/৬ হাজার লোক প্রতি দিন সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণে আসে। এখানকার সুদীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের নিকট খুবই আকর্ষণীয়।
এই কক্সবাজারের প্রাচীন নাম ছিলো ফালকিং। ১৭৯৭ সালের দিকে বার্মার আরাকানে ভীষণ গোলযোগ দেখা দিলে বাঙালিরা পালিয়ে এসে এই ফালকিং, গুনডুম এবং উখিয়া এলাকায় আশ্রয় নেয়। এসময় ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন দূত ক্যাপ্টেন কক্স ঐসকল লোকদের জন্য ত্রান সামগ্রি নিয়ে এখানে আসেন। তিনি বাঙালি শরনার্থীদের দেখাশোনা করতে করতে তাদের প্রতি দরদী হয়ে ওঠেন। তখন এখানকার সমগ্র এলাকা বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিলো এবং পানীয় জলের দারুণ অভাব ছিলো। সেই সাথে মশার উপদ্রব ছিলো অত্যাধিক। বলতে গেলে স্থানটি বসবাসের অযোগ্য ছিলো। তিনি দারুণ অস্বস্থি বোধ করলেও শরনার্থীদের ছেড়ে যেতে রাজি হননি।তাঁর স্বাস্থ্য ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়ে এবং ১৮০২ সালে তিনি কক্সবাজারে মৃত্যবরণ করেন। তাঁর নামানুষারে এই স্থানের নামকরণ করা হয় কক্সবাজার। কারো কারো মতে ক্যাপ্টেন কক্সের অমর প্রেম কাহিনীর স্মৃতি বিজড়িত বলেও সমুদ্র শহর কক্সবাজারকে উল্লেখ করা হয়। প্রাচীন মিথের সেই বিরহ কান্না এখনো অতৃপ্ত প্রেম হাহাকার করে বেড়ায় ধু-ধু বালু চরে। সমুদ্রে কান পাতলে নাকি একনো সেই বিরহ গাঁথার শব্দ শোনা যায় বলে এলাকায় কিংবদন্তী আছে।
আমরা যখন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মূল প্রান্তে তখন বিকেল গড়িয়ে সাঁঝের আগমণী সুর বাজছে। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালার সাথে সেই সুর কিনারে আছড়ে পড়ছে। ভেজা বালির উপর দিয়ে তা গড়িয়ে গড়িয়ে পর্যটকদের পদযুগল চুম্বন করে ফিরে যাচ্ছে বারংবার।
কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে –
“যেন জোয়ার জলের ফেনা রাশি
বাতাসে আজ ছুটছে হাসি।”
সমুদ্র দর্শন আর সমুদ্র উপভোগের এ হিরন্ময় মূহুর্তটি ভাষায় ব্যক্ত করা সুকঠিন। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা –
“ কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা।” (ক্রমশঃ) (লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

এবাদত আলী,
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি.
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব, ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ; ০৬/০৪/২০২৬