এবাদত আলী
তেল শব্দের আভিধানিক অর্থ তৈল। তিল-তিসি, রাই-সরিষা, ভেনলা, গুজি-সয়াবিন, সুর্যমুখি বীজ, পাম ও নারিকেল ইত্যাদির নির্যাসকে তেল বলা হয়। ডিজেল পেট্রোল ও অক্টেনকেও লোকে তেল বলে থাকে।
সাধারণত তিল-তিসি সয়াবিন, পাম ও সরিষার তেল রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। কেউ কেউ চুলের যত্নের জন্য তেল মাথায় মাখে। অনেকে শীতের দিনে সরিষার খাঁটি তেল গায়ে মাখে। গ্রাম-বাংলার মেয়েদের নিকট নারিকেল তেলের কদর অত্যাধিক। তাদের মাথার লম্বা ও ঘন কৃষ্ণ চুলে নারিকেলের তেল মেখে তৃপ্ত হয়।্ধসঢ়; এছাড়া কেরোসিনের তেল নামক এক ধরনের তেল পাওয়া যায়, যা কুপিবাতি, হ্যাজাক, ডে লাইট এবং হ্যারিকেনের জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। সুদুর অতীতে জয়তুন তেল দিয়ে পিদীম জা¦ালাণোর প্রচলন ছিলো। আরেক ধরনের তেল আছে যাকে বলা হয়য় ডিজেল তেল। এই ডিজেল তেল দ্বারা রেল ইঞ্জিন চলে। চলে বাস-ট্রাক ও লরি। পাওয়ার টিলার, নছিমন (ভটভটি) সহ বিভন্ন ধরনের ইঞ্জিন চালিত বাহন চলে ডিজেল তেলে। তেলের খনি থেকে তেল উত্তোলন করে তা রিফাইন করে পেট্রোল ও অকটেন তৈরি করা হয় যা দিয়ে জিপ, কার, মাইক্রোবাস, মোটর সাইকেল বা মোটর বাইক চলে। অকটেনকে আরো রিফাইন করে হেলিকপ্টার ও এ্যারোপেন চালানো হয়।
অতীতে এদেশে বাঁশের চোঙায় কেরোসিন তেল ও পাট দ্বারা এক প্রকার মশাল তৈরি করে আলোর অভাব পুরণ করা হতো। এ সময় রেঢ়ির তেলেরও প্রচলন
ছিল। যা দ্বারা পিদিম বা প্রদীপ-জ্বালানো হতো এবং গরু-মহিষের গাড়ির “ধুরায়” ব্যবহার করা হতো। আগেকার দিনে ঘানিতে তেল ভাঙানো হতো। এই পেশার সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে বলা হতো তেলি বা কলু।
তেল একটি তরল পদার্থ। এর ব্যবহার প্রায় সর্বত্র। বিশেষ করে তেলে ভাজা খাবার সুবই সুস্বাদু। শিশুর মাথার চাঁদিতে সরিষার তেল মাখলে সর্দিকাশি দুর হয়। অজপাড়াগায়ে তেল পড়া দিয়ে বশীকরণ করার কথা এখনো লোকে বিশ্বাস করে। জ্বীন ভূত ছাড়াতে রসুন তেল নাকে দেয়া হয়। রূপক অর্থে তেলের ব্যবহার যত্রতত্র হয়ে থাকে। যেমন গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। অর্থাৎ প্রাপ্তির পুর্বেই ভোগের আয়োজন। কেউ তেজ বা অহংকার প্রদর্শন করলে বলা হয় ওর খুব তেল বেড়েছে অথবা ওর গায়ে তেল যেন উপচে পড়ছে।
কষ্মিনকালেও যে পোকা তেল চুরি করে না বা গায়ে কোন তেল মাখে না কিংবা তেলের কাটতির জন্য নারীদেরকে যেমন মডেল হিসাবে টিভির পর্দায় দেহ প্রদর্শন করানো হয় তেমন কষ্মটি কোনদিনও করেনা এমনি ধরনের গৃহপালিত একটি পোকাকে লোকে বলে তেলচোরা বা তেলেপাকা।
তেলের সঙ্গে সর্ম্পকহীন অনুরূপ একটি মাছকে বলা হয় তেলাপিয়া মাছ। পটলের ন্যায় ছোট ছোট ফল বিশেষ যা পাকলে রক্তবর্ণ হয় এর শিকড় কিংবা লতাপাতা হতে কোন দিনও এক ফোটা তেল পাওয়া যায় না অথচ লোকে বলে তেলাকোচা। ক্রোধে কেউ অগ্নিশর্মা হলে বলা হয় তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা। তৈলাক্ত ও মলিন কোন বস্তুকে বলা হয় তেল চিট চিটে। শুস্ক মুখ মন্ডলে তেল-জল মাখলে ক্ষনিকের জন্য হলেও মুখের লাবন্যতা ফিরে আসে।
কাউকে তোষামোদ করাকে বলা হয় তেলানো। অন্যের উপর দিয়ে স্বার্থ উদ্ধার অর্থে ব্যবহার করা হয় যেমন কইয়ের তেলে কৈ ভাজা। যে কাজটি
কেউ কোন দিন পরীক্ষা নীরিক্ষা করে দেখেনি অথচ অহরহ বলে থাকে অর্থাৎ কুকুরের লেজে তেল দিলে কখনো লেজ সোজা হবে না। অর্থাৎ একই ব্যক্তির নিকট বার বার চেষ্টা তদবির করে বিফল হবার পর আক্ষেপ সুচক এ ধরনের কথা বলা হয়ে থাকে। যে চিত্র তেল দ্বারা নির্মিত নয় বা তেলে চুবিয়ে ফ্রেমে বাঁধানো হয়না অথচ সেই চিত্রকে বলা হয় তৈল চিত্র।
অনুরূপভাবে গ্রামাঞ্চলে এক প্রকার ছোট লোহাকে তেলে কাঁটা বলা হয়। শোনা যায় আমাদের দেশে অনেক চোরই নাকি ঘরের ডোয়ায় সিঁদ
কেটে চুরি কর্ম সম্পাদনের আগে গায়ে এক ধরনের বিশেষ তেল মেখে নেয় যাতে ধরা পড়লে সহজেই পিছলে পালানো যায়।
এদেশে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অধিক মুনাফা লাভের আশায় হঠাৎ করে আশাতীত ভাবে ভোজ্য তেলের মূল্য বাড়িয়ে ক্রেতাসাধারণকে ভোগান্তির মাঝে ফেলে দেয়। এতে নিরুপায় ভোক্তাগণ সরকারকে দোষারোপ করে থাকে। ফলে সরকারের সংশ্লিষ্ট মšী¿ কখনও কখনও তেল নিয়ে
তেলেসমাতি করার কারণে ব্যবসায়ীদের উপর চটে গিয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে
ওঠেন। কারো স্বাস্থ্য হঠাৎ ভালো হলে বলে ওর শরীর দিয়ে যেন তেল চুইয়ে
পড়ছে। কালোর উপমা হিসাবে অনেক সময় বলা হয় ওর চেহারা তেল কুচকুচে কালো। গোত্রে গোত্রে মিল না পড়লে বলা হয় তেলে আর জলে মিশ
খায়না। তেল নিয়ে আমাদের দেশের উত্তরাঞ্চলে একটি প্রবাদ বাক্য চালু আছে- অর্থাৎ- “যার পাছায় আছে তেল সে খায় জয়-সাগরের বেল।”
কোন কাজে কেউ গাফিলতি করলে তাকে তিরস্কার সূচক বাক্য প্রয়োগ তেলের ব্যবহার বিদ্যমান- যেমন নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো। ভালোমত তেল
দিতে পারলে অধস্তন কর্মচারী বা কর্মকর্তার প্রতি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বেজায় খুশি হন। তাতে পদন্নোতির পথ সু-প্রশস্থ হয়। সুবিধামত
স্থানে বদলীর পথও সুগম হয়।
তাই- “ফেঁকো কড়ি মাখো তেল” এমন নীতিতে বিশ্বাস স্থাপনকারীরা অসাধ্য সাধনে পটিয়সী হয়। ঠিকমত তেল দিতে পারলে সহজেই অভিমানী ব্যক্তির মান ভাঙানো যায়।
স্বার্থোদ্ধারের জন্য এ সমাজে একে অপরকে তেল দিয়ে থাকে। তেল নিয়ে তাই তেলেসমাতিও হয়। কল-কারখানার শ্রমিকরা মালিক পক্ষকে মায়না
বাড়ানোর জন্য তেল দেয়। যাত্রীরা ভাড়া না বাড়ানোর জন্য বাস-মিনিবাস মালিক কিংবা ট্র্যাক্সি চালক-রিক্সা চালককে তেল দেয়। অতি সম্প্রতি
মোটর বাইকারগণ তেলের (পেট্রোল ও অক্টেনের) আশায় দীর্ঘ লাইন ধরেও পেট্রোল পাম্প থেকে আশানুরুপ তেল পাচ্ছেনা। দু এক জায়গায় তেলের
জন্য লাঠা-লাঠি হবার কথাও শোনা গেছে। সরকার বলছে দেশে তেলের কোন
কমতি নেই। পর্য়াপ্ত তেল মজুদ আছে। অথচ বাইকারদের মাঝে হাহাকার ডেকে গেছে। তারা পাম্প মালিক ও কর্মচারিদেরকে তেল দিয়েও চাহিদামত তেল (পেট্রোল-অক্টেন) পাচ্ছেনা বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
ইদানিং তেল নিয়ে একটি গান বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে” তেল গেলে ফুরাইয়া বাত্তি যায় নিভিয়া।” সত্যি সত্যিই কি তেলের অভাবে
বাত্তি নিভে যাবে?
(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,আটঘরিয়া প্রেসক্লাব
ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তাং ২৬/০৩/২০২৬
